দেখা এ দেশে সত্য হইয়া থাকে এবং আমাদের হৃদয় তাহাকে সেইরূপেই যদি উপলব্ধি করিয়া থাকে, তবে কবির বাল্যজীবনের মাধুর্যময় চিত্ররস আমাদের উপভোগ্য হইবে না কেন? বুড়া বয়সে কবি নিজে যে সেই বাল্যের স্মৃতিগুলি আঁকিতেছেন, তাহার মধ্যে তাঁহার নিজের কি একটি নিগূঢ় উপভোগ নাই? সেই তাঁহার ‘সুকুমার আমি’টিকে তিনি কী করুণ, কী সুন্দর করিয়াই দেখিতেছেন। এক দিক দিয়া দেখিতে গেলে তাঁহার বাল্যজীবন কিছুমাত্র সুখকর ছিল না। ‘ভৃত্যরাজকতন্ত্রে’র শাসনে কত ক্লেশ ছিল, তখন বাড়ির বাহিরেও তাঁহার অবাধ গতিবিধি নাই, ভিতরেও নাই। কিন্তু সেই সুকুমার কিশোরটিকে সেই সকল ক্লেশে কি কিছুমাত্র ম্লান করিয়াছিল? সেই বাড়ির ধারের বাগান পুকুর ও বটগাছ দেখিয়াই কতদিন তাঁহার আনন্দে কাটিয়াছে। মধ্যাহ্নআকাশের খরদীপ্তি ও তাহার স্তব্ধতার মধ্যে চিলের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ও ফেরিওয়ালার করুণ হাঁক কী উন্মনা করিয়া দিয়াছে। সেই নারিকেল-তরুশ্রেণী লেবুগাছ ও অন্যান্য দু-একটা তরু-বিশিষ্ট বাড়ির ভিতরের বাগানটিই মানবের আদিম স্বর্গকাননের মতো ছিল, শরতের শিশিরস্নাত সোনালি প্রত্যুষে সেইখানেই কত আনন্দে, কত বিস্ময়ে, হৃদয় কম্পিত হইয়াছে। এই তো শৈশবলীলা—ইহা বৈষ্ণবী গোষ্ঠলীলার ন্যায় কিছুমাত্র ভাবগত জিনিস (idealised) নয়―কিন্তু সম্পূর্ণ বাস্তব হইয়াও চিত্ররসের মোহের জন্য ইহাকে পড়িতে কী অপরূপ কাব্যের মতো বোধ হয়। এ কাব্য বাল্য জীবনের কাব্য।
আমার বিশ্বাস, পরিণত বয়সে কবি যে তাঁহার অপূর্ব ‘শিশু’ কাব্যখানি রচনা করিয়াছিলেন, সেও এই স্মৃতি অবলম্বনেই। জীবনস্মৃতির এই গোড়াকার অংশের সঙ্গে তাহার খুবই সাদৃশ্য আছে, তবে কবিতা বলিয়া তাহা খুঁটিনাটি বর্ণনা-বর্জিত। অথচ সেই খুঁটিনাটির জন্যই এই গ্রন্থে চিত্রগুলি এমন ভরাট হইয়াছে। ‘শিশু’ কাব্যটি শিশুদের জন্য