করিয়াছে। সারালো জমিতে বৃক্ষের বাড়িবার পক্ষে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু আপনার অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তির দ্বারাই সে বড়ো হইয়া উঠে। কবি ওয়ার্ড্স্ওয়ার্থ্ যে বলিয়াছেন যে ‘genius is the introduction of a new element in the intellectual universe’—প্রতিভা ভাবজগতে একটি নূতন বস্তুর ন্যায় আবির্ভূত হয়, তাহার দ্বারা ভাবজগৎ নূতন ভাবে গড়িয়া উঠে—রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সে কথা খুবই সত্য। দুঃখের বিষয়, যেখান হইতে সেই ‘new element’, নূতন বস্তুত্বের সূত্রপাত, সেইখানেই তাহার গ্রন্থের সূত্রও কবি ছিন্ন করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার যৌবনবয়সের রচনা ভগ্নহৃদয়ের প্রসঙ্গে এই গ্রন্থে তিনি তাঁহার কালের ভাবজগৎ সম্বন্ধে একটুখানি আলোচনা করিয়াছেন—তাহা অল্পের মধ্যে সম্পূর্ণ একটি চিত্র হইয়াছে। কবি বলিতেছেন, তখনকার দিনে ইংরেজি সাহিত্য খাদ্যের পরিবর্তে মাদক জোগাইয়াছিল। হৃদয়াবেগের যে প্রবলতা ইংরেজি সাহিত্যে পাওয়া যাইত তাহার উদ্দীপনা ও মত্ততাকেই সাহিত্যরসভোগ বলিয়া সেই সময়ে কল্পনা করা হইত। ইউরোপে সাহিত্যের হৃদয়াবেগের উদ্দামতা সেখানকার ইতিহাস হইতে সাহিত্যে প্রতিফলিত হইয়াছিল, আমাদের দেশে সেই ইতিহাস পশ্চাতে না থাকায় উদ্দাম ভাবোচ্ছ্বাস অত্যন্ত অবাস্তব ও অসংযত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেকালের এক দিকে নাস্তিকতা, অন্য দিকে প্রতিমাপূজার ভাবরসসম্ভোগ, উভয়েরই বাস্তববিচ্ছিন্ন ভাবুকতাকে কবি বেশ চমৎকার করিয়াই দেখাইয়াছেন।
এই বস্তুশূন্যতা ও অসুস্থ ভাবুকতা যে কবির রচনাকে প্রথমে অধিকার করিয়া বসিবে তাহাতে বিচিত্র কিছুই নাই। কিন্তু তাঁহার প্রতিভার ‘new element’, নূতন সৃজনী শক্তি, সে অবস্থাকে কাটাইয়া উঠিতে সমর্থ হইয়াছিল। জীবনস্মৃতি পাঠ করিয়া আমরা জানি যে, সেই হৃদয়ারণ্য হইতে নিষ্ক্রমণের একটি দ্বার কবির নিকট আবাল্যই উন্মুক্ত