ছিন্নপত্র
ইউরোপে কোনো বড়ো কবি বা মনীষী মারা গেলে তাঁহার জীবনচরিত, চিঠিপত্র, তাঁহার সম্বন্ধে ছোটো-বড়ো সকলপ্রকার জ্ঞাতব্য সংবাদ মোটা মোটা ভল্যুমে বাহির হইতে দেখা যায়। কবিদের সম্বন্ধে মানুষের কৌতূহল যেন কিছুতেই নিবৃত্ত হইতে চায় না—তাঁহারা যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতে তৃপ্তি নাই, যাহা প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে তাহাকেও সকলের ব্যগ্র দৃষ্টির সম্মুখে তুলিয়া ধরা চাই।
এইজন্য অনেক সময় অঘটনের সৃষ্টি হয় এ কথা সত্য। এমন অনেক লোকের জীবনচরিত বাহির হয় যাহা বাহির না হইলে জগতের কোনো ক্ষতি ছিল না। চিঠিপত্র এমন অনেক প্রকাশিত হয় যাহা হইতে কবি সম্বন্ধে কোনো নতুন পরিচয় পাওয়া যায় না।
বিশেষ কিছুই পাওয়া না গেলে তেমন অনিষ্টের হয় না—কিন্তু অনেক সময় এমন হয় যে, যে কবিকে তাঁহার রচনায় বড়ো বলিয়া জানিয়াছি, চিঠিপত্রে বা জীবনচরিতে তাঁহার মহিমা খর্ব হইয়া পড়ে। তাঁহার ভাবজীবন হইতে দৃষ্টিকে সরাইয়া বাস্তবজীবনে ফেলিতেই দেখি যে, মানুষটিকে যেমনটি কল্পনা করিয়াছিলাম তেমনটি নহে।
এ-সকল আশঙ্কার কারণ সত্য হইলেও এখনকার কালে কবিদের প্রচ্ছন্ন থাকিবার কোনো উপায় নাই। কারণ, এ কথা সত্য যে, তাঁহাদের সম্বন্ধে যতই জানা যাইবে, ততই তাঁহাদিগকে বুঝিবার সাহায্য হইবে। অবশ্য তাঁহাদের জীবনের এমন অনেক দিক থাকিতে পারে যাহার সঙ্গে কাব্যের কোনো সম্বন্ধই নাই, যাহা নিতান্তই বাহিরের দিক। কিন্তু জীবনের ভিতর হইতে যখন কাব্য প্রতিফলিত হইতেছে তখন জীবনের অন্ধিতে সন্ধিতে যতই প্রবেশ করা যাইবে ততই অন্তর্লোকের এমন-সকল রহস্যের সন্ধান পাওয়া যাইবে যাহা কাব্যের পূর্ণ রসগ্রহণের পক্ষে অমূল্য।