বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৮৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৮২
কাব্যপরিক্রমা

এইজন্য ছোটো-বড়ো সকল খবরই চাই—অনেক কিছু সংগ্রহ হইলে তখন তাহার মধ্য হইতে বাছিয়া লওয়া যাইতে পারে।

 ইউরোপের শ্রেষ্ঠ সমালোচক স্যাঁৎ ব্যভ (Sainte Beuve) যে-সকল লোকের সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন তাহা পাঠ করিলে দেখা যায় যে, তাঁহাদের সকলেরই চিঠিপত্র হইতে ও অন্যান্য নানা ছোটোখাটো ঘটনা হইতে তাঁহাদের অন্তরের প্রতিকৃতিটি তিনি আঁকিয়া তুলিতে পারিয়াছেন। জুবেয়ার, মাদাম রোল্যাঁ শীর্ষক তাঁহার প্রবন্ধগুলি পড়িলে এ কথা সুস্পষ্ট হইবে। ম্যাথু আর্নল্ড্ অনেক সমালোচনায় এই পন্থা অবলম্বন করিয়া কৃতকার্য হইয়াছেন।

 ইহার কারণ, চিঠিপত্র যে শুধুই সংবাদ বহন করিবার কাজ করে তাহা নহে, চিঠিপত্রও মানুষের ভাবপ্রকাশের একটা উপায়। যেমন নাট্য-উপন্যাসে, যেমন প্রবন্ধ গল্প বা গীতিকবিতায় মনের ভাবকে মানুষ বাহিরে স্থায়ী আকার দান করিয়া সার্থক হয়, চিঠিতেও আর-এক রকমে তাহার সেই কার্যই সাধিত হয়। উপন্যাসে বা নাটকে ব্যক্তিগত প্রকাশের স্থান অল্প—সেখানে চিত্তভাবকে নানা লোকচরিত্রের ঘাতপ্রতিঘাতের ভিতর দিয়া প্রশস্ত ক্ষেত্রে ছাড়া দিয়া প্রকাশ করিতে হয়। ছোটো গল্পে সে ক্ষেত্র আরো একটু সংকীর্ণ, কবিতাতে বা প্রবন্ধে আরো বেশি—সুতরাং সেখানে নিজের মনের কথা বেশ সহজেই বলা যাইতে পারে। কিন্তু বোধ হয় সকলের চেয়ে নিবিড়ভাবে মনের কথা বলা যায় চিঠিতে; তাহার কারণ চিঠিতে একমাত্র মনের মানুষকে বলা হয়, বাহিরের পাঠকসমাজ সেখানে প্রবেশ করিতে পায় না।

 ‘যেমন বাছুর কাছে এলে গোরুর বাঁটে আপনি দুধ জুগিয়ে আসে, তেমনি মনের বিশেষ রস কেবল বিশেষ বিশেষ উত্তেজনায় আপনি সঞ্চারিত হয়, অন্য উপায়ে হবার জো নেই। এই চারপৃষ্ঠা চিঠি মনের ঠিক যে রস দোহন করতে পারে, কথা কিম্বা প্রবন্ধ কখনোই তা পারে না।’