কবিবর রবীন্দ্রনাথের নবপ্রকাশিত গ্রন্থ ‘ছিন্নপত্র’ হইতেই এই অংশটি উদ্ধৃত করিলাম। এই পুস্তকের সকল চিঠিতেই ঐ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাস্তবিক কবি ইহাতে আপনার যে পরিচয় দিয়াছেন তাহা তাঁহার কবিতা ও প্রবন্ধ হইতে স্বতন্ত্র, কারণ ইহাতে তাঁহার ভাবের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আপনি ধরা পড়িয়াছেন।
সেইজন্য এই চিঠিগুলিতে কোনো কলাচাতুরী নাই, ভাষার ইন্দ্রজাল নাই। নানা লোকের হৃদয়ে প্রবেশের জন্য কবিকে স্বভাবতই যে-সকল মোহিনী মায়ার আশ্রয় লইতে হয়, নারীর অবগুণ্ঠনের মতো যে কারুপূর্ণ আবরণটুকু নহিলে তাঁহার সৌন্দর্যই প্রকাশ পায় না, এখানে তাহার কোনো আবশ্যকতা ঘটে নাই। কারণ, এখানে একজনের কাছেই সব বলা হইতেছে।
কিন্তু কবির জীবিতকালে এই পত্রগুলি প্রকাশিত হইতেছে বলিয়া ইহাদিগকে তিনি ছিন্ন আকারে উড়াইয়া দিয়াছেন। অর্থাৎ, সবটা দিতে পারেন নাই। সম্ভবত সংকোচ তাহার কারণ। এই জন্য এই চিঠির টুকরাগুলির মধ্যে সেই ব্যক্তিগত রসটি নাই, চিঠিমাত্রেরই যেটি বিশেষ রস। একটি পূর্ণপ্রস্ফুটিত কমল শতদলে বিদীর্ণ হইয়া বিক্ষিপ্তভাবে ইতস্তত ভাসিয়া বেড়াইলে তাহার যেমন অবস্থা হয়, এই ছিন্নপত্রগুলিরও সেইরূপ অবস্থা হইয়াছে। ইহার প্রত্যেকটি পত্র সেই নন্দনগন্ধটুকু বহন করিতেছে বটে, কিন্তু ছিন্ন হইবার বেদনার রক্তলেখা ইহাদের গায়ে লাগিয়া আছে।
কিন্তু না, আমি বোধ হয় ভুল করিতেছি। এ চিঠিগুলি ঠিক ছিন্নদলের মতো নয়, কারণ ইহাদের মধ্যে একটি ভাবসামঞ্জস্য দেখিতে পাইতেছি। ১৮৮৫ হইতে ১৮৯৫ খৃস্টাব্দ―দশ বৎসর কালের এই চিঠিগুলি। কিন্তু পড়িতে পড়িতে এই দীর্ঘকালের ব্যবধান কিছুই অনুভূত হয় না। দশ বৎসরে কত বড়ো বড়ো পরিবর্তন হইয়া যাইতে