পারে, কত রাজ্য-সাম্রাজ্য ভাঙিতে পারে গড়িতে পারে, কত কীর্তি ভূমিসাৎ হইতে পারে, কিন্তু একটি মানুষের নদীর উপরে নৌকাবাসের জীবনে পরিবর্তন নাই। মালার সূত্রে ফুলের পর ফুলের মতো দিনের পর দিন গ্রথিত হইয়া চলিয়াছে, পূর্ণ বিশ্বসৌন্দর্যের পায়ে নিবেদনের একটি সাজি সুগন্ধে আমোদিত হইয়া ভরিয়া উঠিয়াছে। কী নিবিড়, কী গভীর, কী আশ্চর্য এই মানুষটির অনুভূতি এবং উপভোগ। মনে হয় পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য সার্থক যে, একজনও তাঁহাকে এমন একান্ত আগ্রহে, এমন বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে হৃদয় ভরিয়া দেখিয়াছে।
পরিপূর্ণ সৌন্দর্যানুভূতির এই ভাব ঐক্য এই ছিন্নপত্রগুলির মাঝখানে সূত্রের মতো থাকায় ইহারা আর এলোমেলোভাবে উড়িতে পারে নাই। ইহাদের মধ্যে এই একটিমাত্র কথা—
‘হে চিরসুন্দর, আমি তোরে ভালোবাসি।’
তাহাই ‘শেষ কথা’ এবং চিরকালের কথা। সোনার ভাবের কালীতে লেখা পরম সুন্দর কথা।
তথাপি এগুলি ছিন্ন করিবার বেদনা আমার মন হইতে মুছিতেছে না। চিঠিকে সাহিত্যের কড়া বাটখারায় ওজন করিয়া তাহার কতটুকু রাখিতে হইবে এবং কতটুকু ছাঁটিতে হইবে তাহা হিসাব না করিলেই ভালো হয়। কারণ, চিঠি তো আর সাহিত্যের মতো করিয়া লেখা হয় নাই, তাহার অলংকারের অভাবই তাহার সকলের চেয়ে বড়ো মূল্য। অবশ্য চিঠির মধ্যে ব্যক্তিগত অংশ বেশি থাকিলে তাহা সর্বসাধারণের উপভোগ্য হয় না—কিন্তু এ-সকল চিঠিতে কেহ তো গয়লার হিসাব বা সংসার খরচের তালিকা প্রত্যাশা করে না। এ তো কাজের চিঠি নয়, ভাবের চিঠি। মানুষকে লেখা হইলেও এ স্থলে মানুষ অনেকটা পরিমাণেই উপলক্ষ। বোধ হয়, বিশ্বপ্রকৃতি যদি ভাষা জানিত এবং তাহার সঙ্গে মোকাবিলায় আলাপের কোনো সুযোগ থাকিত, তবে এই চিঠিগুলি তাহারই নিকটে প্রেরিত হইত।