বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৮৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ছিন্নপত্র
৮৫

সুতরাং এ চিঠিগুলি যেমন ছিল তেমনি বাহির করিলে কী ক্ষতি ছিল!

 হিসাব করিয়া দেখি, ‘মানসী’ ‘সোনার তরী’ ও ‘চিত্রা’ যে সময়ের মধ্যে রচিত হইতেছে, ‘সাধনা’ চলিতেছে, এবং গল্পগুচ্ছ একটির পর একটি করিয়া তৈরি হইতেছে, এই চিঠিগুলি সেই সময়ের। মানসীর সময়ের চিঠি অতি অল্পই আছে, বোধ হয় শ্রীশবাবুর নিকটে লিখিত গোড়াকার চিঠিগুলি বাদে আর বেশি নাই। অধিকাংশ চিঠিই সোনার তরী ও চিত্রা রচনার সময়ের, এবং প্রায়ই শিলাইদহ ও পতিসর হইতে লিখিত। তখন জমিদারি পরিচালনার কার্যে কবি বোটে বাস করিতেছিলেন।

 ইহার পূর্বে বাংলাদেশের এমন ঘনিষ্ঠ পরিচয়-লাভের সুযোগ কবির ঘটে নাই। জীবনস্মৃতিতে দেখি যে, ‘সন্ধ্যাসংগীত’ রচনাকালে চন্দননগরের গঙ্গাতীরে এবং ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ লিখিবার সময়ে গুজরাট অঞ্চলে কারোয়ারের সমুদ্রতীরে বাস ব্যতীত, বিশ্বপ্রকৃতির সহবাস কবির ভাগ্যে বেশি ঘটে নাই। অবশ্য তাহাতে কবির চিত্ত যে উপবাসী হইয়া ছিল এমন নয়—কারণ ‘যিনি দেনেওয়ালা তিনি গলির মধ্যে এক মুহূর্তে বিশ্বসংসারকে দেখাইয়া দিতে পারেন’—সৌন্দর্য-উপভোগ বাহিরের আয়োজনের উপর নির্ভর করে না। তথাপি মনে হয় যে, এই সময়ে নদীপথে নৌকায় করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইয়া বাংলার গ্রাম্য প্রকৃতি ও গ্রাম্যজীবনের প্রত্যক্ষ পরিচয় না লাভ করিলে কবির স্বাভাবিক বিশ্বানুভূতি কখনোই বাস্তব রূপ পাইত না। ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’, ‘বৈষ্ণব কবিতা’, ‘পুরস্কার’, ‘বসুন্ধরা’, ‘জীবনদেবতা’ প্রভৃতি যে-সকল কবিতা ভাবে ও প্রকাশে ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করিয়া বিশ্বের জিনিস হইয়া উঠিয়াছে, যাহাদের অর্থ সীমাবদ্ধ তত্ত্বমাত্র নহে কিন্তু বিচিত্ররূপে ব্যঞ্জনাপূর্ণ, যাহাদের ভিতরকার দৃষ্টি বিশ্বপ্রসারিত, এবং প্রকাশ উপমায় ও রূপে জীবন্ত ও বস্তুগত—আমি তো কখনোই মানিতে রাজি নই যে কবি আপনার ভাবজীবনকে পরিপুষ্ট করিয়া লইবার এমন অবসর না পাইলে