বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৯৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৯২
কাব্যপরিক্রমা

গান গাহিলে গির্জায় অধিকাংশ লোকের কখনোই ভালো লাগিবে না।

 কিন্তু ইউরোপে তত্ত্বজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হওয়ায়, সেখানকার ধর্মসংগীত শুধু কেন, ধর্মসম্বন্ধীয় সকল প্রকারের আলোচনাই বড়ো বেশি প্রথাগত সংস্কারগত ও স্থূলধারণাপূর্ণ হইয়াছে। সেখানকার অধিকাংশ ধর্মসংগীতের বন্দনীয় ভগবান জিহোভা হইয়াছেন বটে, কিন্তু ব্রহ্ম হন নাই। তাঁহার শক্তি প্রতাপ ন্যায়দণ্ড করুণা প্রভৃতি সকলপ্রকার ভাবই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্থূল রূপকের দ্বারা আচ্ছন্ন। সেইজন্য পশ্চিমের ধর্মসংগীত শুনিলে হৃদয়ে একপ্রকার ভক্তিরস জাগে বটে, পাপবোধ উগ্র হয় এবং ঈশ্বরের করুণা ও ক্ষমার জন্য ব্যাকুলতার উদ্রেক হয়, কিন্তু আমাদের অন্তরস্থিত তত্ত্বজ্ঞানী মন তৃপ্ত হয় না। সে মাথা নাড়িয়া বলে—উঁহু, এ-সকল ভাবোচ্ছ্বাস সত্যপ্রতিষ্ঠ নয়।

 ইউরোপের ন্যায় আমাদের দেশে কোনো উপাসকমণ্ডলীর মধ্যে ঐরূপ তত্ত্বাধারশূন্য ভাবুকতাপূর্ণ সস্তাদরের ধর্মগীত-প্রচলনের কোনো কারণ দেখি না, কারণ আমাদের দেশে অধ্যাত্মসাধনা তত্ত্বজ্ঞানকে আশ্রয় করিয়াছে; পক্ষান্তরে তত্ত্বজ্ঞান অধ্যাত্মসাধনার ভিতর হইতে সারসংগ্রহ করিয়াছে— দোঁহে দোঁহার অবলম্বন। উপনিষদকেই বলে বেদান্ত ও শ্রেষ্ঠবিদ্যা, তাহারই উপর ভর করিয়া সকল তত্ত্বশাস্ত্র ভারতবর্ষে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে। অথচ তাহাকে সাধকের গভীরতম অধ্যাত্ম-উপলব্ধির অপূর্ব প্রকাশ করিয়া চিরদিনই ভারতবর্ষ শ্রদ্ধা করিয়া আসিয়াছে। ভগবদ্‌গীতা শ্রীমদ্ভাগবত প্রভৃতি সকল শাস্ত্র সম্বন্ধেই সেই এক কথা—তাহা হইতে এক ধারা গিয়াছে তত্ত্বজ্ঞানের দিকে, অন্য ধারা গিয়াছে কাব্য ও সংগীতের দিকে। এই উভয় ধারাই ভারতবর্ষে চিরকাল পরস্পর পরস্পরকে পরিপুষ্ট করিয়া আসিয়াছে। সেই জন্য ভারতের শ্রেষ্ঠ ধর্মসংগীতগুলি ইউরোপের ধর্মসংগীতের ন্যায় অকবিদের দ্বারা রচিত নহে। তাহা তত্ত্বদর্শী সাধক কবিদিগের রচনা।