তথাপি প্রবন্ধারম্ভে যাহার কথা উল্লেখ করিয়াছি সেই ভক্তিভাজন ধর্মাচার্য, রবীন্দ্রনাথের আধুনিক গীতগুলি উপাসনাকে পূর্ণ করিতে সমর্থ নহে এ কথা বলিলেন কেন? রবীন্দ্রনাথের পূর্বেকার ধর্মসংগীতগুলি প্রচলিত ব্রহ্মোপাসনার ভাব অবলম্বন করিয়াই রচিত। তখন কবির স্বকীয় কোনো অধ্যাত্ম-অনুভূতি জাগে নাই—তিনি আপনার অভিজ্ঞতাকে আপনি বাণীরূপে প্রকাশ করিতে আরম্ভ করেন নাই। সুতরাং তখনকার গানগুলি প্রচলিত উপাসনার সুরের সঙ্গে সুর মিলাইয়াছে। কিন্তু তাঁহার আধুনিক গানগুলি যে তাঁহার কাব্যজীবনেরই চরম পরিণতি স্বরূপে আবির্ভূত হইয়াছে। ইহারা তো প্রথাগত নহে, আত্মগত—দশের জিনিস নহে, একলার। তাহা হউক, ইহারা যে সত্য সে বিষয়ে তো সন্দেহ নাই। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথাগত জিনিস স্বাধীন স্বকীয় জিনিসের চেয়ে চিত্তকে অধিক আকর্ষণ করিবে, এ কথার অর্থ কী? সেই আলোচনাতেই প্রবৃত্ত হওয়া যাক।
এই আমি যে বসিয়া লিখিতেছি, আমার সম্মুখে বর্ষার জলসিক্ত কাননে কত শুভ্র ফুলই ফুটিয়াছে দেখিতেছি। যেন শ্যামদুকূল-পরা ছোটো ছোটো বনকন্যাদের কপালে কেহ শ্বেতচন্দনের টিপ পরাইয়া দিয়াছে। আমি দেখিতেছি, ঐ প্রত্যেকটি পুষ্প যে তরুতে ফুটিয়াছে সেই সমস্ত তরুটিরই সে প্রতিমা। উহার দণ্ডটি তরুকাণ্ডেরই মতো, উহার দলে দলে কত শিরাউপশিরা ডালপালার মতো কত সূক্ষ্ম ভঙ্গিমায় আঁকিয়া বাঁকিয়া গিয়াছে। দলরাজি আবার পল্লবগুলিকে রূপান্তরিত করিয়া কোথা হইতে এক আশ্চর্য সৌরভ এবং বর্ণ লাভ করিয়াছে এবং আপনাদিগকে বৃক্ষ হইতে স্বতন্ত্র করিয়া কোন্ একটি ভাবী সফলতার বীজকোষকে গর্ভের মধ্যে আবৃত করিয়া একটির সঙ্গে একটি কেমন এক সুন্দর বন্ধনে মিলিত হইয়াছে! জীবনের মধ্যে ধর্মের প্রকাশও কি ঠিক এইরূপ নয়? সমস্ত জীবনের হাসিকান্না ভোগ চপলতা হইতে ধর্ম স্বতন্ত্র বটে, কিন্তু সে স্বাতন্ত্র্য কি বিচ্ছেদের স্বাতন্ত্র্য না পরিণামের স্বাতন্ত্র্য? আমার সমস্ত জীবন ভরিয়া আমি প্রকৃতির