বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৯৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৯৪
কাব্যপরিক্রমা

কত সৌন্দর্য দেখিয়া মুগ্ধ হইতেছি, কত নরনারীর প্রণয়বন্ধনে কত হাসিকান্নার ভিতর দিয়া যাইতেছি, আমার কর্মপ্রবৃত্তি আমাকে দিয়া কত কী করাইতেছে, কত কল্যাণ ও অকল্যাণের সৃষ্টি করিয়া জয়পরাজয়ের মধ্য দিয়া আমায় ঠেলিয়া লইয়া চলিয়াছে। সেই-সমস্ত অভিজ্ঞতার উপর, অনুভাবের উপর আমার ভাবনা আমার কল্পনা কত রঙ মিশাইতেছে, তত্ত্বজ্ঞান কত গভীরতর মূলে ইহাদের মধ্যে সত্যকে অনুসন্ধান করিতেছে। এই-যে দেখিতেছি আমার জীবনের লীলা—আমার ধর্মবোধ কি এই লীলার অন্তর্গত নয়? সে কি ইহাকে এক পাশে সরাইয়া দিয়া তবে প্রকাশ পাইবে? সে কি এই বিচিত্র ডালপালাময় জীবনতরুটিরই শাখাগ্রভাগে ফুলের মতো ফুটিবে না? এই সমস্তকেই রূপান্তরিত করিয়া ভগবৎপ্রসাদের একটি সুগন্ধ হিল্লোল এবং নানা রঙের এক আনন্দতরঙ্গ বহাইবে না?

 অনেকেই জীবন হইতে ধর্মের স্বাতন্ত্র্যকে এইরূপ পরিণামের স্বাতন্ত্র্যরূপ দেখেন না, কিন্তু বিচ্ছেদের স্বাতন্ত্র্যরূপেই দেখিয়া থাকেন। তাঁহারা মুখে যতই অস্বীকার করুন, তাঁহারা সমস্ত জীবনের গান শুনিতে এবং শুনাইতে ভয় পান এবং জীবনটাকে অত্যন্ত কৃশমলিন, অত্যন্ত পাপজীর্ণ কল্পনা করিয়া তৃপ্তি বোধ করিয়াও থাকেন। জীবনের বিচিত্র রাগ—সৌন্দর্যবোধের রাগ, মাধুর্যের রাগ, কল্যাণের রাগ, কল্পনার রাগ, ভাবের রাগ—এ-সমস্ত রাগ এবং রাগিণীর কোনো সার্থকতা তাঁহাদের মধ্যে দেখা যায় না। তাঁহারা রাগবর্জিত রসবর্জিত নীতিবোধকে আশ্রয় করিয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ শূদ্রের মতো, শ্বেতকায়-কৃষ্ণকায়ের মতো তাঁহাদের কাছে ভালো এবং মন্দ একেবারে সুনির্দিষ্ট। কারণ, কী যে ভালো এবং কী যে মন্দ তাহা কিনা কতকগুলি বাঁধা বাহিরের নিয়মের উপরই নির্ভর করে। জীবনের অভিব্যক্তিতে বাঁধা ভালো যে দেখিতে দেখিতে কোন্ মন্দের মুক্তক্ষেত্রে একেবারে মত্ত অশ্বের মতো রাশ-আলগা হইয়া ছুটিয়া যায় এবং মন্দও যে কী বিচিত্র উপায়ে ভালো হইয়া উঠে,