ব্রাহ্মধর্মের ইতিহাসেও খৃস্টধর্মের প্রভাবে এক সময়ে পাপবোধ সকল রস ও সৌন্দর্য হইতে ধর্মকে সরাইয়া লইয়া অত্যন্ত একদেশবর্তী শুষ্ক এক পদার্থ করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু এখানেও এক মহাকবির গান সেই ধর্মকে সেই একদেশের অতিপ্রভাব হইতে রক্ষা করিয়া তাহাকে ভারতের চিরন্তন রসসাধনা ভক্তিসাধনার ধারার সঙ্গে যুক্ত করিয়া দিতেছে।
ম্যাক্লিফ-সাহেব শিখধর্ম-নামক তাহার রচিত গ্রন্থে গুরু নানকের যে-সকল ভজন সংগ্রহ করিয়া ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়াছেন এবং ক্ষিতিমোহনবাবু ওয়েস্ট্কট প্রভৃতির উপর নির্ভর না করিয়া কবীরের যে বাক্যাবলী মূল হইতে উদ্ধার করিয়া বাংলায় অনুবাদ করিয়াছেন, তাহা পাঠ করিলে একটি কথা বেশ সুস্পষ্ট হইয়া উঠে যে, রবীন্দ্রনাথের ধর্মসংগীতের সঙ্গে এই ধর্মবাক্যগুলি ভাবে রসে প্রকাশে, এমন-কি অনেক সময় উপমা-অলংকারের সাদৃশ্যেও এক। রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন—
বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়।
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ।
কবীর কহেন, তরুকে ছাড়িয়া যেমন বনকে খুঁজিয়া পাইবে না, তেমনি তিনি বিচ্ছিন্নভাবে মিলিবেন না।
কহৈঁ কবীর বিছুড় নহিঁ মিলিহো
জ্যো তরবর ছোড় বনমাধরী—
ঐ একই কথা!
কবীর নানক প্রভৃতি ভক্তদের গান পাপবোধের দ্বারা আক্রান্ত নয়। আমারই ভিতর সমস্ত বিশ্ব পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে, আমারই জীবনের মধ্যে সমস্ত বিশ্বসৌন্দর্য অবাধে ফুটিতেছে—তাহাদের গান এই আনন্দের সুরে বাঁধা।