পাতা:কালান্তর - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কালাস্তর গাছপালা পশুপক্ষীকে স্তন্তদান করিতেছে। জলই সমুদ্র হইতে আকাশে উঠিতেছে, আকাশ হইতে পৃথিবীতে নামিতেছে, মলিনকে ধৌত করিতেছে, পুরাতনকে নূতন ও শুষ্ককে সরস করিয়া তুলিতেছে। পৃথিবীর উপর দিয়া যে জীবের প্রবাহ নব নব ধারায় চলিয়ছে তাহার মূলে এই জলেরই ধারা । স্থলের একাধিপত্য যে কী ভয়ংকর তাহা মধ্য-এশিয়ার মরুপ্রাস্তরের দিকে তাকাইলেই বুঝা যাইবে । তাহার অচলতার তলে কত বড়ো বড়ো শহর লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। যে পুরাতন পথ বাহিয়া ভারতবর্ষ হইতে চীনে জাপানে পণ্য ও চিত্ত -বিনিময় চলিত, এই রুদ্র মরু সে পথের চিহ্ন মুছিয়া দিল ; কত যুগের প্রাণচঞ্চল ইতিহাসকে বালু চাপা দিয়া সে কঙ্কালসার করিয়া দিয়াছে । উলঙ্গ ধূর্জটি সেখানে এক স্থাণু হইয়া উর্ধ্বনেয়ে বসিয়া আছেন ; উমা নাই। দেবতারা তাই প্রমাদ গণিতেছেন– কুমারের জন্ম হইবে কেমন করিয়া ? নূতন প্রাণের বিকাশ হইবে কী উপায়ে ? জোর করিয়া চোখ বুজিয়া যদি না থাকি, তবে নিজের সমাজের দিকে তাকাইলেও এই চেহারাই দেখিতে পাইব । এখানে স্থলের স্থাবরতা ভয়ংকর হইয়া বসিয়া আছে– এ যে পঙ্ককেশের শুভ্র মরুভূমি । এখানে এক কালে যখন প্রাণের রস বহিত তখন ইতিহাস সজীব হইয়া, সচল হইয়া, কেবল যে এক প্রদেশ হইতে আর-এক প্রদেশে ব্যাপ্ত হইত তাহা নহে— মহতী স্রোতস্বিনীর মতো দেশ হইতে দেশাস্তরে চলিয়া যাইত । বিশ্বের সঙ্গে সেই প্রাণবিনিময়ের, সেই পণ্যবিনিময়ের ধারা ও তাহার বিপুল রাজপথ কবে কোন কালে বালু চাপ পড়িয়া গেছে। এখানে সেখানে মাটি খুড়িয়া বাহনদের কঙ্কাল খুজিয়া পাওয়া যায়, পুরাতত্ত্ববিদের খনিত্রের মুখে পণ্যসামগ্রীর দুটো একটা ভাঙা টুকরা উঠিয়া পড়ে। গুহাগহবরে গহনে সেকালের শিল্পপ্রবাহিণীর কিছু কিছু ংশ আটক পড়িয়া গেছে ; কিন্তু আজ তাহ স্থির, তাহার ধারা নাই । ૨૨