পাতা:গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১০৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৬১৩
গল্পগুচ্ছ

পণরক্ষা


বংশীবদন তাহার ভাই রসিককে যেমন ভালােবাসিত এমন করিয়া সচরাচর মাও ছেলেকে ভালােবাসিতে পারে না। পাঠশালা হইতে রসিকের আসিতে যদি কিছু বিলম্ব হইত তবে সকল কাজ ফেলিয়া সে তাহার সন্ধানে ছুটিত। তাহাকে না খাওয়াইয়া সে নিজে খাইতে পারিত না। রসিকের অল্প-কিছু অসুখবিসুখ হইলেই বংশীর দুই চোখ দিয়া ঝর্ ঝর্ করিয়া জল ঝরিতে থাকিত।
 রসিক বংশীর চেয়ে যােলাে বছরের ছােটো। মাঝে যে কয়টি ভাইবােন জন্মিয়াছিল সবগুলিই মারা গিয়াছে। কেবল এই সব-শেষেরটিকে রাখিয়া যখন রসিকের এক বছর বয়স তখন তাহার মা মারা গেল এবং রসিক যখন তিন বছরের ছেলে তখন সে পিতৃহীন হইল। এখন রসিককে মানুষ করিবার ভার একা এই বংশীর উপর।
 তাঁতে কাপড় বােনাই বংশীর পৈতৃক ব্যবসায়। এই ব্যাবসা করিয়াই বংশীর বৃদ্ধ-প্রপিতামহ অভিরাম বসাক গ্রামে যে দেবালয় প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছে আজও সেখানে রাধানাথের বিগ্রহ স্থাপিত আছে। কিন্তু, সমুদ্রপার হইতে এক কল-দৈত্য আসিয়া বেচারা তাঁতের উপর অগ্নিবাণ হানিল এবং তাঁতির ঘরে ক্ষুধাসুরকে বসাইয়া দিয়া বাষ্পফুৎকারে মুহুর্মুহু জয়শৃঙ্গ বাজাইতে লাগিল।
 তবু তাঁতের কঠিন প্রাণ মরিতে চায় না—ঠুকঠাক ঠুকঠাক করিয়া সুতা দাঁতে লইয়া মাকু এখনও চলাচল করিতেছে—কিন্তু তাহার সাবেক চালচলন চঞ্চলা লক্ষ্মীর মনঃপূত হইতেছে না, লােহার দৈত্যটা কলে বলে কৌশলে তাঁহাকে একেবারে বশ করিয়া লইয়াছে।
 বংশীর একটু সুবিধা ছিল। থানাগড়ের বাবুরা তাহার মুরুব্বি ছিলেন। তাঁহাদের বৃৃহৎ পরিবারের সমুদয় শৌখিন কাপড় বংশীই বুনিয়া দিত। একলা সব পারিয়া উঠিত না, সেজন্য তাহাকে লােক রাখিতে হইয়াছিল।
 যদিচ তাহাদের সমাজে মেয়ের দর বড়াে বেশি, তবু চেষ্টা করিলে বংশী এতদিনে যেমন-তেমন একটা বউ ঘরে আনিতে পারিত। রসিকের জন্যই সে আর ঘটিয়া উঠিল না। পূজার সময় কলিকাতা হইতে রসিকের যে সাজ আমদানি হইত তাহা যাত্রার দলের রাজপুত্রকেও লজ্জা দিতে পারিত। এইরূপ আর-আর সকল বিষয়েই রসিকের যাহা-কিছু প্রয়ােজন ছিল না তাহা জোগাইতে গিয়া বংশীকে নিজের সকল প্রয়ােজনই খর্ব করিতে হইল।
 তবু বংশরক্ষা করিতে তাে হইবে। তাহাদের বিবাহযােগ্য ঘরের একটি মেয়েকে মনে মনে ঠিক করিয়া বংশী টাকা জমাইতে লাগিল। তিন-শাে টাকা পণ এবং অলংকার বাবদ আর এক-শাে টাকা হইলেই মেয়েটিকে পাওয়া যাইবে স্থির করিয়া অল্প-অল্প কিছু-কিছু সে খরচ বাঁচাইয়া চলিল। হাতে যথেষ্ট টাকা ছিল না বটে, কিন্তু যথেষ্ট সময় ছিল। কারণ, মেয়েটির বয়স সবে চার—এখনাে অন্তত চার-পাঁচ বছর মেয়াদ পাওয়া যাইতে পারে।
 কিন্তু, কোষ্ঠীতে তাহার সঞ্চয়ের স্থানে দৃষ্টি ছিল রসিকের। সে দৃষ্টি শুভ-গ্রহের দৃষ্টি নহে।
 ৪০