পাতা:গল্পগুচ্ছ (প্রথম খণ্ড).djvu/১৪১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
১৩৭
একটা আষাঢ়ে গল্প

 মুখে কাহারও ঈর্ষা, কাহারও অনুরাগ, কাহারও ব্যাকুলতা, কাহারও সংশয়। কোথাও হাসি, কোথাও রােদন, কোথাও সংগীত। সকলেরই নিজের নিজের প্রতি এবং অন্যের প্রতি দৃষ্টি পড়িয়াছে। সকলেই আপনার সহিত অন্যের তুলনা করিতেছে।

 টেক্কা ভাবিতেছে, ‘সাহেব ছােকরাটাকে দেখিতে নেহাত মন্দ না হউক কিন্তু উহার শ্রী নাই— আমার চাল-চলনের মধ্যে এমন একটা মাহাত্ম্য আছে যে, কোনাে কোনাে ব্যক্তিবিশেষের দৃষ্টি আমার দিকে আকৃষ্ট না হইয়া থাকিতে পারে না।’

 সাহেব ভাবিতেছে ‘টেক্কা সর্বদা ভারি টক্‌টক্‌ করিয়া ঘাড় বাঁকাইয়া বেড়াইতেছে; মনে করিতেছে, উহাকে দেখিয়া বিবিগুলা বুক ফাটিয়া মারা গেল।’ বলিয়া ঈষৎ বক্র হাসিয়া দর্পণে মুখ দেখিতেছে।

 দেশে যতগুলি বিবি ছিলেন সকলেই প্রাণপণে সাজসজ্জা করেন আর পরস্পরকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, ‘আ মরিয়া যাই। গর্বিণীর এত সাজের ধুম কিসের জন্য গো বাপু। উহার রকম-সকম দেখিয়া লজ্জা করে!’ বলিয়া দ্বিগুণ প্রযত্নে হাবভাব বিস্তার করিতে থাকেন।

 আবার কোথাও দুই সখায়, কোথাও দুই সখীতে গলা ধরিয়া নিভৃতে বসিয়া গােপন কথাবার্তা হইতে থাকে। কখনাে হাসে, কখনাে কাঁদে, কখনাে রাগ করে, কখনো মান-অভিমান চলে, কখনাে সাধাসাধি হয়।

 যুবকগুলা পথের ধারে বনের ছায়ায় তরুমূলে পৃষ্ঠ রাখিয়া, শুষ্কপত্ররাশির উপর পা ছড়াইয়া, অলসভাবে বসিয়া থাকে। বালা সুনীল বসন পরিয়া সেই ছায়াপথ দিয়া আপন-মনে চলিতে চলিতে সেইখানে আসিয়া মুখ নত করিয়া চোখ ফিরাইয়া লয়— যেন কাহাকেও দেখিতে পায় নাই, যেন কাহাকেও দেখা দিতে আসে নাই, এমনি ভাব করিয়া চলিয়া যায়।

 তাই দেখিয়া কোনাে কোনাে খেপা যুবক দুঃসাহসে ভর করিয়া তাড়াতাড়ি কাছে অগ্রসর হয়, কিন্তু মনের মতাে একটাও কথা জোগায় না; অপ্রতিভ হইয়া দাঁড়াইয়া পড়ে, অনুকূল অবসর চলিয়া যায় এবং রমণীও অতীত মুহূর্তের মতাে ক্রমে ক্রমে দূরে বিলীন হইয়া যায়।

 মাথার উপরে পাখি ডাকিতে থাকে, বাতাস অঞ্চল ও অলক উড়াইয়া