পথ-হারা।
অস্তাচলগামী মরীচিমালীর রশ্মিতে পশ্চিম গগন সিন্দূররঞ্জিত হইয়া গেল, দেখিতে দেখিতে সোনার খালাখানি অদৃশ্য হইল। গঙ্গাতীরের অদূরে বৃক্ষরাজীর মধ্যে গ্রামখানি অবস্থিত, ধান্য ক্ষেত্রের মধ্য দিয়া উভয়ে সেই দিকে চলিতেছিল। পবন হিল্লোলে সুপক্ক ধান্যশীর্ষগুলি আন্দোলিত হইতেছিল, মনে হইতেছিল গঙ্গাতীরে হরিদ্বর্ণ সরোবরের বিশাল বক্ষে তরঙ্গরাশি নৃত্য করিতেছে। ধান্তক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া উভয়ে অন্ধকারে মিশাইয় গেল।
গ্রামখানির নাম দৌলতপুর, ইহার অধিকাংশ অধিবাসীই ভদ্রলোক। গ্রামের জমিদার গ্রামেই বাস করেন। পূর্ব্বে তাঁহার অবস্থা ভাল ছিল না, বহু কষ্টে লেখা-পড়া শিখিয়া উকিল হইয়াছিলেন, তাহার পর তাঁর ভাগ্য ফিরিল, চঞ্চলা লক্ষ্মী ঠাকুরাণী গ্রামের বুনিয়াদী জমিদার গৃহ পরিত্যাগ করিয়া সদাশিব মিত্রের গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেনার দায়ে যখন জমিদার প্রবোধচন্দ্র ঘোষের যথা-সর্ব্বস্ব বিক্রয় হইয়া গেল, তখন সদাশিব মিত্র বাস-গ্রামখানি কিনিয়া লইলেন; এখন তিনিই গ্রামের জমিদার। সদাশিব পূর্ব্বে বড় গ্রামে আসিতেন না; কিন্তু জমিদার খরিদ করিবার পর হইতে ছুটির সময় গ্রামে আসিয়া থাকেন, দুই একটি করিয়া পূজা-পার্ব্বণও আরম্ভ করিয়াছেন। গ্রামের কেহ কেহ পূর্ব্ব-অভ্যাস মত প্রবোধ বাবুকে জমিদার বলিয়া ফেলিলে, মিত্র মহাশয় বড়ই অসন্তুষ্ট হন।
পুরাতন জমিদার-বংশ লোপ হইতে চলিয়াছে। প্রবোধ বাবুর বয়স প্রায় পঞ্চাশ বৎসরের কাছাকাছি, সুরমা তাহার এক মাত্র কন্যা, আর সন্তান হইবার কোন আশাও নাই। প্রবোধ বাবু সময় সময় দুঃখ করিয়া