পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪১৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


রহিল না— অদ্যকার সমস্ত ছােটো বিরােধগুলি একটা প্রকাণ্ড চরিতার্থতায় কোথায় মিলাইয়া গেল।

 গােরা যখন আনন্দময়ীর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল তখন তাহার মুখ আনন্দের আভায় দীপ্যমান, তখন তাহার চক্ষু যেন সম্মুখস্থিত সমস্ত পদার্থের পশ্চাতে আর-একটি কোন্ অপরূপ মূর্তি দেখিতেছে। প্রথমেই হঠাৎ আসিয়া সে যেন ভালো করিয়া চিনিতে পারিল না, ঘরে তার মার কাছে কে বসিয়া আছে।

 সুচরিতা উঠিয়া দাঁড়াইয়া গােরাকে নমস্কার করিল। গােরা কহিল, “এই-যে আপনি এসেছেন, বসুন।”

 গােরা এমন করিয়া বলিল ‘আপনি এসেছেন’, যেন সুচরিতার আসা একটা সাধারণ ঘটনার মধ্যে নয়, এ যেন একটা বিশেষ আবির্ভাব।

 একদিন সুচরিতার সংস্রব হইতে পাের পলায়ন করিয়াছিল। যতদিন পর্যন্ত সে নানা কষ্ট এবং কাজ লইয়া ভ্রমণ করিতেছিল ততদিন সুচরিতার কথা মন থেকে অনেকটা দূরে রাখিতে পারিয়াছিল। কিন্তু জেলের অবরােধের মধ্যে সুচরিতার স্মৃতিকে সে কোনােমতেই ঠেকাইয়া রাখিতে পারে নাই। এমন এক দিন ছিল যখন ভারতবর্ষে যে স্ত্রীলােক আছে সে কথা গােরার মনে উদয়ই হয় নাই। এই সত্যটি এতকাল পরে সে সুচরিতার মধ্যে নূতন আবিষ্কার করিল; একেবারে এক মুহূর্তে এতবড়াে একটা পুরাতন এবং প্রকাণ্ড কথাকে হঠাৎ গ্রহণ করিয়া তাহার সমগ্র বলিষ্ঠ প্রকৃতি ইহার আঘাতে কম্পিত হইয়া উঠিল। জেলের মধ্যে বাহিরের সূর্যালােক এবং মুক্ত বাতাসের জগৎ যখন তাহার মনের মধ্যে বেদনা সঞ্চার করিত তখন সেই জগৎটিকে কেবল সে নিজের কর্মক্ষেত্র এবং কেবল সেটাকে পুরুষসমাজ বলিয়া দেখিত না-যেমন করিয়াই সে ধ্যান করিত বাহিরের এই সুন্দর জগৎসংসারে সে কেবল দুটি অধিষ্ঠাত্রী দেবতার মুখ দেখিতে পাইত, সূর্যচন্দ্রতারার আলােক বিশেষ করিয়া তাহাদেরই মুখের উপর পড়িত, স্নিগ্ধ নীলিমামণ্ডিত আকাশ তাহাদেরই মুখকে বেষ্টন করিয়া থাকিত- একটি মুখ তাহার আজন্ম-

৪০৮