পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪৬৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


বলছি। আমি কতদিন ভেবেছি, বিনয়কে যে লাভ করবে এমন ভাগ্যবতী কে আছে। মাঝে মাঝে সম্বন্ধ এসেছে, কাউকে আমার পছন্দ হয় নি। আজ দেখতে পাচ্ছি, ওরও ভাগ্য বড়াে কম নয়।”

 এই বলিয়া আনন্দময়ী ললিতার চিবুক হইতে চুম্বন গ্রহণ করিয়া লইলেন ও বিনয়কে ডাকিয়া আনিলেন। কৌশলে লছমিয়াকে ঘরের মধ্যে বসাইয়া তিনি ললিতার আহারের আয়ােজন উপলক্ষ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গেলেন।

 আজ আর ললিতা ও বিনয়ের মধ্যে সংকোচের অবকাশ ছিল না। তাহাদের উভয়ের জীবনে যে-একটি কঠিন সংকটের আবির্ভাব হইয়াছে। তাহারই আহ্বানে তাহারা পরস্পরের সম্বন্ধকে সহজ করিয়া ও বড়াে করিয়া দেখিল তাহাদের মাঝখানে কোনাে আবেশের বাষ্প আসিয়া রঙিন আবরণ ফেলিয়া দিল না। তাহাদের দুই জনের হৃদয় যে মিলিয়াছে এবং তাহাদের দুই জীবনের ধারা গঙ্গাযমুনার মতাে একটি পুণ্যতীর্থে এক হইবার জন্য আসন্ন হইয়াছে, এ সম্বন্ধে কোনাে আলােচনামাত্র না করিয়া এ কথাটি তাহারা বিনীত গম্ভীর ভাবে নীরবে অকুণ্ঠিতচিত্তে মানিয়া লইল। সমাজ তাহাদের দুই জনকে ডাকে নাই, কোনাে মত তাহাদের দুই জনকে মেলায় নাই, তাহাদের বন্ধন কোনাে কৃত্রিম বন্ধন নহে, এই কথা স্মরণ করিয়া তাহারা নিজেদের মিলনকে এমন একটি ধর্মের মিলন বলিয়া অনুভব করিল যে ধর্ম অত্যন্ত বৃহৎ ভাবে সরল, যাহা কোনাে ছােটো কথা লইয়া বিবাদ করে না, যাহাকে কোনাে পঞ্চায়েতের পণ্ডিত বাধা দিতে পারে না। ললিতা তাহার মুখচক্ষু দীপ্তিমান করিয়া কহিল, ‘আপনি যে হেঁট হইয়া নিজেকে খাটো করিয়া আমাকে গ্রহণ করিতে আসিবেন, এ অগৌরব আমি সহ্য করিতে পারিব না। আপনি যেখানে আছেন সেইখানেই অবিচলিত হইয়া থাকিবেন, এই আমি চাই।’

 বিনয় কহিল, ‘আপনার যেখানে প্রতিষ্ঠা আপনিও সেখানে স্থির থাকিবেন, কিছুমাত্র আপনাকে নড়িতে হইবে না। প্রীতি যদি প্রভেদকে স্বীকার করিতে না পারে, তবে জগতে কোনাে প্রভেদ কোথাও আছে কেন।’

৪৫৭