পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


 গােরা কহিল, “যে ভক্ত নয় সে কিসের পূজা করে তাতে কার কী আসে যায়। ব্রাহ্মসমাজে যে লােক ভক্তিহীন সে কী করে? তার সমস্ত পূজা অতলস্পর্শ শূন্যতার মধ্যে গিয়ে পড়ে। না, শূন্যতার চেয়ে ভয়ানক- দলাদলিই তার দেবতা, অহংকারই তার পুরােহিত। এই রক্তপিপাসু দেবতার পূজা তােমাদের সমাজে কি কখনাে দেখ নি?”

 এই কথার কোনাে উত্তর না দিয়া সুচরিতা গােরাকে জিজ্ঞাসা করিল, “ধর্ম সম্বন্ধে আপনি এই যা-সব বলছেন এ কি আপনি নিজের অভিজ্ঞতার থেকে বলছেন?”

 গােরা ঈষৎ হাসিয়া কহিল, “অর্থাৎ, তুমি জানতে চাও, আমি কোনােদিনই ঈশ্বরকে চেয়েছি কি না। না, আমার মন ও দিকেই যায় নি।”

 সুচরিতার পক্ষে এ কথা খুশি হইবার কথা নহে, কিন্তু তবু তাহার মন যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। এইখানে জোর করিয়া কোনাে কথা বলিবার অধিকার যে গােরার নাই, ইহাতে সে একপ্রকার নিশ্চিন্ত হইল।

 গােরা কহিল, “কাউকে ধর্মশিক্ষা দিতে পারি এমন দাবি আমার নেই। কিন্তু আমার দেশের লােকের ভক্তিকে তােমরা যে উপহাস করবে এও আমি কোনােদিন সহ্য করতে পারব না। তুমি তােমার দেশের লােককে ডেকে বলছ ‘তােমরা মূঢ়, তােমরা পৌত্তলিক’; আমি তাদের সবাইকে আহ্বান করে জানাতে চাই, ‘না, তােমরা মুঢ় নও, তােমরা পৌত্তলিক নও, তােমরা জ্ঞানী, তােমরা ভক্ত। আমাদের ধর্মতত্ত্বে যে মহত্ত্ব আছে, ভক্তিতত্ত্বে যে গভীরতা আছে, শ্রদ্ধাপ্রকাশের দ্বারা সেইখানেই আমার দেশের হৃদয়কে আমি জাগ্রত করতে চাই; যেখানে তার সম্পদ আছে সেইখানে তার অভিমানকে আমি উদ্যত করে তুলতে চাই। আমি তার মাথা হেঁট করে দেব না, নিজের প্রতি তার ধিক্কার জন্মিয়ে নিজের সত্যের প্রতি তাকে অন্ধ করে তুলব না। এই আমার পণ। তােমার কাছেও আজ আমি এই জন্যেই এসেছি। তােমাকে দেখে অবধি একটি নূতন কথা দিনরাত্রি আমার মাথায় ঘুরছে। এতদিন সে কথা আমি ভাবি নি। কেবলই আমার মনে হচ্ছে,

৪৬৭