পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৫০০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


দেখতে পাচ্ছ তারা একটি লােকও তার একটুও দেখে নি। তােমার মধ্যে সেই গভীর দৃষ্টিশক্তি আছে সে আমি তােমাকে দেখেই অনুভব করেছিলুম; সেই জন্যেই আমি আমার এতকালের হৃদয়ের সমস্ত কথা নিয়ে তােমার কাছে এসেছি, আমার সমস্ত জীবনকে তােমার সামনে মেলে দিয়েছি, কিছুমাত্র সংকোচ বােধ করি নি।”

 সুচরিতা কহিল, “আপনি অমন করে যখন বলেন আমার মনের মধ্যে ভারী একটা ব্যাকুলতা বােধ হয়। আমার কাছ থেকে আপনি কী আশা করছেন, আমি তার কী দিতে পারি, আমাকে কী কাজ করতে হবে, আমার মধ্যে যে-একটা ভাবের আবেগ আসছে তার প্রকাশ যে কিরকম, আমি কিছুই বুঝতে পারছি নে। আমার কেবলই ভয় হতে থাকে, আমার উপরে আপনি যে বিশ্বাস রেখেছেন সে পাছে সমস্তই ভুল বলে একদিন আপনার কাছে ধরা পড়ে।”

 গােরা মেঘগম্ভীর কণ্ঠে কহিল, “সেখানে ভুল কোথাও নেই। তােমার ভিতরে যে কত বড়াে শক্তি আছে সে আমি তােমাকে দেখিয়ে দেব। তুমি কিছুমাত্র উৎকণ্ঠা মনে রেখাে না— তােমার যে যােগ্যতা সে প্রকাশ করে তােলবার ভার আমার উপরে রয়েছে, আমার উপরে তুমি নির্ভর কোরাে।”

 সুচরিতা কোনাে কথা কহিল না, কিন্তু নির্ভর করিতে তাহার যে কিছুই বাকি নাই এই কথাটি নিঃশব্দে ব্যক্ত হইল। গােরাও চুপ করিয়া রহিল; ঘরে অনেক ক্ষণ কোনাে শব্দই রহিল না, বাহিরে গলিতে পুরানো-বাসনওয়ালা পিতলের পাত্রে ঝন্ ঝন্ শব্দ করিয়া দ্বারের সম্মুখ দিয়া হাঁকিতে হাঁকিতে চলিয়া গেল।

 হরিমােহিনী তাঁহার পূজাহ্নিক শেষ করিয়া পাকশালায় যাইতেছিলেন। সুচরিতার নিঃশব্দ ঘরে যে কোনাে লােক আছে তাহা তাঁহার মনেও হয় নাই কিন্তু ঘরের দিকে হঠাৎ চাহিয়া হরিমােহিনী যখন দেখিলেন সুচরিতা ও গােরা চুপ করিয়া বসিয়া ভাবিতেছে, উভয়ে কোনােপ্রকার শিষ্টালাপ

৪৯০