পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৫৩৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


ভারতবাসীকে সতর্ক হইয়া চেষ্টা করিতে হয় নাই। আর কি তেমন নিশ্চিন্ত হইয়া বাঁচিবার সময় আছে। আজ কি পূর্বের মতাে কেবল পুরাতন ব্যবস্থাকে আশ্রয় করিয়া ঘরের মধ্যে বসিয়া থাকিতে পারি!

 সুচরিতা ভাবিতে লাগিল, ‘ইহার মধ্যে আমারও তাে একটা কাজ আছে সে কাজ কী।’ গােরার উচিত ছিল, এই সময়ে তাহার সম্মুখে আসিয়া তাহাকে আদেশ করা, তাহাকে পথ দেখাইয়া দেওয়া। সুচরিতা মনে মনে কহিল, ‘আমাকে তিনি যদি আমার সমস্ত বাধা ও অজ্ঞতা হইতে উদ্ধার করিয়া আমার যথাস্থানে দাঁড় করাইয়া দিতে পারিতেন তবে কি সমস্ত ক্ষুদ্র লােকলজ্জা ও নিন্দা অপবাদকে ছাড়াইয়াও তাহার মূল্য ছাপাইয়া উঠিত না?’ সুচরিতার মন আত্মগৌরবে পূর্ণ হইয়া দাঁড়াইল। সে বলিল, গােরা কেন তাহাকে পরীক্ষা করিলেন না, কেন তাহাকে অসাধ্য সাধন করিতে বলিলেন না— গােরার দলের সমস্ত পুরুষের মধ্যে এমন একটি লােক কে আছে যে সুচরিতার মতাে এমন অনায়াসে নিজের যাহা-কিছু আছে সমস্ত উৎসর্গ করিতে পারে? এমন একটা আত্মত্যাগের আকাঙ্ক্ষা ও শক্তির কি কোনাে প্রয়ােজন গােরা দেখিল না? ইহাকে লােকলজ্জারবেড়া-দেওয়া কর্মহীনতার মধ্যে ফেলিয়া দিয়া গেলে তাহাতে দেশের কিছুমাত্র ক্ষতি নাই? সুচরিতা এই অবজ্ঞাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করিয়া দূরে সরাইয়া দিল। সে কহিল, ‘আমাকে এমন করিয়া ত্যাগ করিবেন এ কখনােই হইতে পারিবে না। আমার কাছে তাঁহাকে আসিতেই হইবে, আমাকে তাঁহার সন্ধান করিতেই হইবে, সমস্ত সজ্জা সংকোচ তাহাকে পরিত্যাগ করিতেই হইবে— তিনি যতবড়ো শক্তিমান পুরুষ হােন, আমাকে তাঁহার প্রয়ােজন আছে, এ কথা তাঁহার নিজের মুখে একদিন আমাকে কলিয়াছেন— আজ অতি তুচ্ছ জল্পনায় এ কথা কেমন করিয়া ভুলিলেন!’

 সতীশ ছুটিয়া আসিয়া সুচরিতার কোলের কাছে দাঁড়াইয়া কহিল, “দিদি!”

 সুচরিতা তাহার গলা জড়াইয়া কহিল, “কী ভাই বক্তিয়ার!”

৫২৭