পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৫৫০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


অবিবাহিত থাকিতে হয়। এ দিকে বিধবা বিবাহ সম্বন্ধে কঠিন নিষেধ। ইহাতে ঘরে ঘরে সমাজের স্বাস্থ্য দূষিত হইয়া উঠিতেছে এবং ইহার অনিষ্ট ও অসুবিধা সমাজের প্রত্যেক লােকই অনুভব করিতেছে; এই অকল্যাণ চিরদিন বহন করিয়া চলিতে সকলেই বাধ্য, কিন্তু ইহার প্রতিকার করিবার উপায় কোথাও কাহারও হাতে নাই। শিক্ষিতসমাজে যে গােরা আচারকে কোথাও শিথিল হইতে দিতে চায় না সেই গােরা এখানে আচারকে আঘাত করিল। সে ইহাদের পুরােহিতদিগকে বশ করিল, কিন্তু সমাজের লােকদের সম্মতি কোননামতেই পাইল না। তাহারা গােরার প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল; কহিল, ‘বেশ তাে, ব্রাহ্মণেরা যখন বিধবাবিবাহ দিবেন আমরাও তখন দিব।’

 তাহাদের রাগ হইবার প্রধান কারণ এই যে, তাহারা মনে করিল গােরা তাহাদিগকে হীনজাতি বলিয়া অবজ্ঞা করিতেছে, তাহাদের মতো লােকের পক্ষে নিতান্ত হীন আচার অবলম্বন করাই যে শ্রেয় ইহাই গােরা প্রচার করিতে আসিয়াছে।

 পল্লীর মধ্যে বিচরণ করিয়া গােরা ইহাও দেখিয়াছে, মুসলমানদের মধ্যে সেই জিনিসটি আছে যাহা অবলম্বন করিয়া তাহাদিগকে এক করিয়া দাঁড় করানাে যায়। গােরা লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছে, গ্রামে কোনাে আপদ বিপদ হইলে মুসলমানেরা যেমন নিবিড়ভাবে পরস্পরের পার্শ্বে আসিয়া সমবেত হয় হিন্দুরা এমন হয় না। গােরা বার বার চিন্তা করিয়া দেখিয়াছে, এই দুই নিকটতম প্রতিবেশী সমাজের মধ্যে এতবড়ো প্রভেদ কেন হয়। যে উত্তরটি তাহার মনে উদিত হয় সে উত্তরটি কিছুতেই তাহার মানিতে ইচ্ছা হয় না। এ কথা স্বীকার করিতে তাহার সমস্ত হৃদয় ব্যথিত হইয়া উঠিতে লাগিল যে, ধর্মের দ্বারা মুসলমান এক, কেবল আচারের দ্বারা নহে। এক দিকে যেমন আচারের বন্ধন তাহাদের সমস্ত কর্মকে অনর্থক বাঁধিয়া রাখে নাই, অন্য দিকে তেমনি ধর্মের বন্ধন তাহাদের মধ্যে একান্ত ঘনিষ্ঠ। তাহারা সকলে মিলিয়া এমন একটি জিনিসকে গ্রহণ করিয়াছে যাহা ‘না’-মাত্র নহে, যাহা ‘হাঁ’; যাহা

৫৪০