পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৮২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


 আকাশের অন্ধকার এবং শ্রাবণের মেঘ ঘনাইয়া আসিল, বেলফুলের মালা হাঁকিয়া রাস্তা দিয়া ফেরিওয়ালা চলিয়া গেল। সম্মুখের রাস্তায় কৃষ্ণচূড়াগাছের পল্লবপুঞ্জের মধ্যে জোনাকি জ্বলিতে লাগিল। পাশের বাড়ির পুকুরের জলের উপর একটা নিবিড় কলিমা পড়িয়া গেল।

 সান্ধ্য উপাসনা শেষ করিয়া পরেশ ছাতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে দেখিয়া গােরা ও হারান উভয়েই লজ্জিত হইয়া ক্ষান্ত হইল। গােরা উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “রাত হয়ে গেছে, আজ তবে আসি।”

 বিনয়ও ঘর হইতে বিদায় লইয়া ছাতে আসিয়া দেখা দিল। পরেশ গােরাকে কহিলেন, “দেখাে, তােমার যখন ইচ্ছা এখানে এসাে। কৃষ্ণদয়াল আমার ভাইয়ের মতাে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে এখন আমার মতের মিল নেই, দেখাও হয় না, চিঠিপত্র লেখাও বন্ধ আছে, কিন্তু ছেলেবেলার বন্ধুত্ব রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে থাকে। কৃষ্ণদয়ালের সম্পর্কে তােমার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ অতি নিকটের। ঈশ্বর তােমার মঙ্গল করুন।”

 পরেশের সস্নেহ শান্ত কণ্ঠস্বরে গােরার এতক্ষণকার তর্কতাপ যেন জুড়াইয়া গেল। প্রথমে আসিয়া গােরা পরেশকে বড়াে একটা খাতির করে নাই। যাইবার সময় যথার্থ ভক্তির সঙ্গে তাহাকে প্রণাম করিয়া গেল । সুচরিতাকে গােরা কোনােপ্রকার বিদায়সম্ভাষণ করিল না। সুচরিতা যে সম্মুখে আছে ইহা কোনাে আচরণের দ্বারা স্বীকার করাকেই সে অশিষ্টতা বলিয়া গণ্য করিল । বিনয় পরেশকে নতভাবে প্রণাম করিয়া সুচরিতার দিকে ফিরিয়া তাহাকে নমস্কার করিল এবং লজ্জিত হইয়া তাড়াতাড়ি গােরার অনুসরণ করিয়া বাহির হইয়া গেল।

 হারান এই বিদায়সম্ভাষণ-ব্যাপার এড়াইয়া ঘরের মধ্যে গিয়া টেবিলের উপরকার একটি ‘ব্ৰহ্মসঙ্গীত' বই লইয়া তাহার পাতা উল্‌টাইতে লাগিলেন।

 বিনয় ও গােরা চলিয়া যাইবা মাত্র হারান দ্রুতপদে ছাতে আসিয়া পরেশকে কহিলেন, “দেখুন, সকলের সঙ্গেই মেয়েদের আলাপ করিয়ে দেওয়া আমি ভালাে মনে করি নে।”

৭২