পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৯০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


উৎপাটিত করে ফেলবেন, তার পরে দেশ এক হবে, তবে সমুদ্রকে ছেঁচে ফেলে সমুদ্র পার হবার চেষ্টা করা হবে। অবজ্ঞা ও অহংকার দূর ক’রে, নম্র হয়ে, ভালােবেসে নিজেকে অন্তরের সঙ্গে সকলের করুন ; সেই ভালােবাসার কাছে সহস্র ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা সহজেই হার মানবে। সকল দেশের সকল সমাজেই ত্রুটি ও অপূর্ণতা আছে, কিন্তু দেশের লােকে স্বজাতির প্রতি ভালােবাসার টানে যতক্ষণ এক থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তার বিষ কাটিয়ে চলতে পারে। পচবার কারণ হাওয়ার মধ্যেই আছে। কিন্তু, বেঁচে থাকলেই সেটা কাটিয়ে চলি, মরে গেলেই পচে উঠি। আমি আপনাকে বলছি, সংশােধন করতে যদি আসেন তাে আমরা সহ্য করব না, তা আপনারাই হােন বা মিশনারিই হােন।’ পানুবাবু কহিলেন, ‘কেন করবেন না।’ গােরা কহিল, ‘করব না তার কারণ আছে। বাপ-মায়ের সংশােধন সহ্য করা যায়, কিন্তু পাহারাওয়ালার সংশােধনে শােধনের চেয়ে অপমান অনেক বেশি— সেই সংশােধন সহ্য করতে হলে মনুষ্যত্ব নষ্ট হয়। আগে আত্মীয় হবেন, তার পরে সংশােধক হবেন— নইলে আপনার মুখের ভালো কথাতেও আমাদের অনিষ্ট হবে। এমনি করিয়া একটি একটি সমস্ত কথা আগাগােড়া সুচরিতার মনে উঠিতে লাগিল এবং এই সঙ্গে মনের মধ্যে একটা অনির্দেশ্য বেদনাও কেবলই পীড়া দিতে থাকিল । শ্রান্ত হইয়া সুচরিতা বিছানায় ফিরিয়া আসিল এবং চোখের উপর করতল চাপিয়া সমস্ত ভাবনাকে ঠেলিয়া ঘুমাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু তাহার মুখ ও কান ঝাঁ ঝাঁ করিতে লাগিল এবং এই সমস্ত আলােচনা ভাঙিয়া চুরিয়া তাহার মনের মধ্যে কেবলই আনাগােনা করিতে থাকিল।


১২

বিনয় ও গােরা পরেশের বাড়ি হইতে রাস্তায় বাহির হইলে বিনয় কহিল, “গােরা, একটু আস্তে আস্তে চলে ভাই— তােমার পা দুটো আমাদের চেয়ে

৮০