পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৯১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


অনেক বড়াে, ওর চালটা একটু খাটো না করলে তােমার সঙ্গে যেতে আমরা হাঁপিয়ে পড়ি।”

 গােরা কহিল, “আমি একলাই যেতে চাই, আমার আজ অনেক কথা ভাববার আছে।”

 বলিয়া তাহার স্বাভাবিক দ্রুত গতিতে সে বেগে চলিয়া গেল।

 বিনয়ের মনে আঘাত লাগিল। সে আজ গােরার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া তাহার নিয়ম ভঙ্গ করিয়াছে। সে সম্বন্ধে গােরার কাছে তিরস্কার ভােগ করিলে সে খুশি হইত। একটা ঝড় হইয়া গেলেই তাহাদের চিরদিনের বন্ধুত্বের আকাশ হইতে গুমট কাটিয়া যাইত এবং সে হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিত। তাহা ছাড়া আর-একটা কথা তাহাকে পীড়া দিতেছিল। আজ হঠাৎ গােরা পরেশের বাড়িতে প্রথম আসিয়াই বিনয়কে সেখানে বন্ধুভাবে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া নিশ্চয়ই মনে করিয়াছে, বিনয় এ বাড়িতে সর্বদাই যাতায়াত করে। অবশ্য, যাতায়াত করিলে যে কোনাে অপরাধ আছে তাহা নয় ; গােরা যাহাই বলুক, পরেশবাবুর সুশিক্ষিত পরিবারের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে পরিচিত হইবার সুযােগ পাওয়া বিনয় একটা বিশেষ লাভ বলিয়া গণ্য করিতেছে। ইহাদের সঙ্গে মেশামেশি করাতে গোরা যদি কোনাে দোষ দেখে তবে সেটা তাহার নিতান্ত গোঁড়ামি। কিন্তু পূর্বের কথাবার্তায় গােরা নাকি জানিয়াছে যে, বিনয় পরেশবাবুর বাড়িতে যাওয়া-আসা করে না ; আজ, সহসা তাহার মনে হইতে পারে যে, সে কথাটা সত্য নয়। বিশেষত বরদাসুন্দরী তাহাকে বিশেষ করিয়া ঘরে ডাকিয়া লইয়া গেলেন, সেখানে তাঁহার মেয়েদের সঙ্গে তাহার আলাপ হইতে লাগিল— গােরার তীক্ষ্ণ লক্ষ হইতে ইহা এড়াইয়া যায় নাই। মেয়েদের সঙ্গে এইরূপ মেলামেশায় ও বরদাসুন্দরীর আত্মীয়তায় মনে মনে বিনয় ভারি একটা গৌরব ও আনন্দ অনুভব করিতেছিল— কিন্তু সেই সঙ্গে এই পরিবারে গােরার সঙ্গে তাহার আদরের পার্থক্য তাহাকে ভিতরে ভিতরে বাজিতেছিল। আজ পর্যন্ত এই দুই সহপাঠীর নিবিড় বন্ধুত্বের মাঝখানে কেহই বাধাস্বরূপ দাঁড়ায় নাই।

৮১