পাতা:গৌড়রাজমালা.djvu/১০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
লক্ষ্মণাবতী এবং নোদিয়া।

ঐ স্থানের নাম “লক্ষ্মণাবতী” রাখিয়াছিলেন, এমন সম্ভব নহে। ঐ স্থানের নাম আগেই “লক্ষ্মণাবতী” ছিল, এবং উহাই লক্ষ্মণসেনের অন্যতম রাজধানী ছিল। সেনরাজগণের কীর্ত্তিচিহ্ন সেখান হইতে এখনও লুপ্ত হয় নাই। কিম্বদন্তী অনুসারে, লখ্‌ণাবতী বা গৌড়ের ধ্বংসাবশেষের সমীপবর্ত্তী বিশাল সাগরদীঘি লক্ষ্মণসেন খোদাইয়াছিলেন; এবং সাগরদীঘির অনতিদূরস্থিত একটি প্রাচীন দুর্গের ভগ্নাবশেষ এখনও “বল্লালগড়” নামে কথিত হইয়া আসিতেছে। লক্ষ্মণসেনের অপর রাজধানী “বিজয়পুর” মিন্‌হাজুদ্দীন কর্ত্তৃক “নোদিয়াহ্” নামে অভিহিত হইয়া থাকিতে পারে। “পবনদূতের” প্রকাশক প্রবীণ প্রত্নতত্ত্ববিদ্ শ্রীযুত মনোমোহান চক্রবর্ত্তী “নোদিয়াহ্” এবং “নদীয়া” অভিন্ন মনে করিয়া, নদীয়াই বিজয়পুর এইরূপ মত প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু রাজসাহী জেলার রামপুর বোয়ালিয়া সহরের ১০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত [জনশ্রুতি অনুসারে] কুমার রাজার রাজধানী “কুমারপুরের” নিকটবর্ত্তী বিজয় রাজার রাজবাড়ীর ভগ্নাবশেষপূর্ণ “বিজয়নগর”ই পবনদূতের ‘বিজয়পুর’ বলিয়া বোধ হয়। বিজয়সেনের নামানুসারে যে বিজয়পুরের নামকরণ হইয়াছিল, এ বিষয়ে সংশয় নাই; এবং ‘বিজয়নগরে’ও জনশ্রুতি অনুসারে এক বিজয় রাজা ছিল। দানসাগর-মতে বিজয়সেনের প্রাদুর্ভাব-স্থানে [বরেন্দ্রেই] “বিজয়নগর” অবস্থিত, এবং ইহার ৭ মাইল ব্যবধানে বিজয়সেনের শিলালিপির প্রাপ্তি-স্থান “দেবপাড়া” অবস্থিত। দেবপাড়ার ‘পদুমসহর’ নামক তল্ল বিজয়সেনের প্রতিষ্ঠত প্রদ্যুম্নেশ্বরের স্মৃতি এখনও জাগ্রত রাখিয়াছে, এবং “পদুমসহরের” তীরে একটি বৃহৎ দেবমন্দিরের ভগ্নাবশেষ এখনও বিদ্যমান আছে। সুতরাং বিজয়নগরকে বিজয়পুর বলিয়া গ্রহণ করাই সমীচীন বোধ হয়। বিজয়নগর লক্ষ্মণাবতীর ভগ্নাবশেষ হইতে ৪৫ মাইল বাবধানে অবস্থিত; নদীয়া ১১০ মাইল ব্যবধানে অবস্থিত। মিন্‌হাজের বর্ণনানুসারে ‘লখ্‌নাবতী’ হইতে ‘নোদিয়া’ খুব বেশ দূরে অবস্থিত ছিল বলিয়া বোধ হয় না, এবং এই নিমিত্ত বিজয়নগরকেই “নোদিয়াহ্” বলিতে প্রবৃত্তি হয়।

 মহম্মদ-ই-বখ্‌তিয়ার কর্ত্তৃক “কিল্লা-বিহার” অধিকারের বিবরণ সঙ্কলনে ব্রতী হইয়া, মিন্‌হাজুদ্দীন যেমন সেই ব্যাপারে স্বয়ং লিপ্ত এক জন বৃদ্ধ সৈনিকের সাক্ষ্য গ্রহণে সমর্থ হইয়াছিলেন, “নোদিয়াহ্”-অধিকার সম্বন্ধে তেমন কোন সাক্ষাৎ দ্রষ্টার মুখের কথা শুনিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ করিয়া যান নাই। “নোদিয়াহ্”-অধিকার-ব্যাপারে তাঁহার একমাত্র অবলম্বন “বিশ্বাসযোগ্য লোকের” উক্তি। এই সকল “বিশ্বাসযোগ্য লোকেরা”, অর্থাৎ ১২৪২-১২৪৩ খৃষ্টাব্দের লখ্‌নাবতীর তুরূষ্ক রাজপুরুষগণ, মিন্‌হাজকে মহম্মদ-ই-বখ্‌তিয়ারের এবং তাঁহার অনুচরগণের কার্য্যকলাপ সম্বন্ধে সম্ভবত খাঁটি খবরই দিতে পারিয়াছিলেন; কিন্তু মহম্মদ-ই-বখ্‌তিয়ারের “নোদিয়াহ্” প্রবেশের পূর্ব্বে এবং তাঁহার পরোক্ষে নোদিয়ায় যে সকল ঘটনা ঘটিয়াছিল, তৎসম্বন্ধে ইঁহাদের প্রদত্ত বিবরণ তত নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হইতে পারে না। সুতরাং মিন্‌হাজুদ্দীনের বর্ণিত মহম্মদ-ই-বখ্‌তিয়ার কর্ত্তৃক অধিকারের পূর্ব্বের নোদিয়া-বিবরণ বিশেষ বিচার পূর্ব্বক গ্রহণ করা কর্ত্তব্য; এবং যুক্তিবিরুদ্ধ অংশ অমূলক গুজব বলিয়া উপেক্ষনীয়।

৭৫