পাতা:গৌড়রাজমালা.djvu/৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
ঐতিহাসিক বিচার পদ্ধতি।

সঙ্গে জনশ্রুতি অনেক অলৌকিক কাহিনী জড়িত করিয়া দিয়াছে; কল্পনালোলুপ লেখকবৃন্দ তাহাকে অনেক রচনা-মাধুর্য্যে পল্পবিত করিয়া তুলিয়াছেন। কিন্তু কোন্ সময় হইতে, কিরূপ ঘটনাচক্রে, পাল-নরপালগণের অভ্যুদয় সাধিত হইয়াছিল;—কোন্ সময় হইতে, কিরূপ ঘটনাচক্রে তাঁহাদিগের রাজ্য সেন-বংশীয় নরপালগণের করতলগত হইয়া, আবার কালক্রমে হস্তচ্যুত হইয়া গিয়াছিল;—তাহার সহিত দেশের লোকের কতদূর পর্য্যন্ত কিরূপ সম্পর্ক বর্ত্তমান ছিল;—তাহা নানা তর্কবিতর্কে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছে! বাঙ্গালীর ইতিহাসের এই সকল অবশ্য-জ্ঞাতব্য কথা [উপযুক্ত আলোচনা-প্রণালীর অভাবে] জনসাধারণের নিকট শ্রদ্ধালাভ করিতে পারে নাই। এরূপ অবস্থায়, অনুসন্ধান-লব্ধ যৎসামান্য বিবরণের উপর নির্ভর করিয়া, ধারাবাহিক ইতিহাস সঙ্কলন করা কিরূপ কঠিন ব্যাপার, তাহা স্মরণ করিয়াই, “গৌড়রাজমালা” অধ্যয়ন করিতে হইবে। এই গ্রন্থের প্রধান অবলম্বন ‘লেখমালা’,—তাহাতে পুরাতন তাম্রশাসনের এবং শিলালিপির পাঠ, বঙ্গানুবাদ এবং টীকা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। আর এক শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য অবলম্বন,—ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে আবিষ্কৃত তাম্রশাসনের এবং শিলালিপির পাঠ, পুরাতন পুস্তক-নিহিত ঐতিহাসিক জনশ্রুতি, এবং পূর্ব্বাচার্য্যগণের ঐতিহাসিক গবেষণা। তাহা গ্রন্থমধ্যে যথাস্থানে উল্লিখিত হইয়াছে। লেখক মহাশয় যেরূপ প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া, যেরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, তাহা স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। তাহা সঙ্গত হইয়াছে কি না, পাঠক-সমাজ তাহার বিচার করিবেন।

 ইতিহাসের উপাদান সঙ্কলিত না হইলে, ইতিহাস সঙ্কলিত হইতে পারে না;—তাহা বহুব্যয়সাধ্য, বহুশ্রমসাধ্য, বহুলোকসাধ্য;—এ সকল কথা বঙ্গসাহিত্যে পুনঃ পুনঃ উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু ইহাকেই একমাত্র অন্তরায় বলিয়া নিশ্চিন্ত হইবার উপায় নাই। কিরূপ বিচার-পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা কর্ত্তব্য, তদ্বিষয়েও সংকীর্ণতার অভাব নাই। ন্যায়নিষ্ঠ বিচারপতির ন্যায় নিয়ত সত্যোদ্ঘাটনের চেষ্টাই যে ইতিহাস-লেখকের প্রধান চেষ্টা, তাহা ভাল করিয়া আমাদিগের হৃদয়ঙ্গম হইয়াছে বলিয়া বোধ হয় না। কবি কহ্লণ ‘রাজতরঙ্গিণীর’ উপোদ্‌ঘাতে লিখিয়া গিয়াছেন,—

श्लाघ्यः स एव गुणवान् रागद्वेष-बहिष्कृता।
भूतार्थ-कथने यस्य स्थेयस्येव सरस्वती॥

 আমাদিগের সাহিত্যে এই উপদেশ-বাক্য এখনও সম্যক্ মর্য্যাদা লাভ করিতে পারে নাই। এখনও আমাদিগের ব্যক্তিগত, জাতিগত বা সম্প্রদায়গত অনুরাগ-বিরাগ, আমাদিগকে পূর্ব্ব হইতেই অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অনুকূল বা প্রতিকূল করিয়া রাখিয়াছে। পালবংশের এবং সেনবংশের নরপালগণের শাসন-সময়ে দেশের অবস্থা কিরূপ দাঁড়াইয়াছিল, তাহা যেন তুচ্ছ কথা,—তাঁহাদিগের জাতি কি ছিল, তাহাই এখনও আমাদিগের নিকট প্রধান আলোচ্য

৶৹