চিত্রে জয়দেব
বাংলা যেদিন ভেতর থেকে প্রাণহীন, শক্তিহীন হয়ে ভেঙ্গে পড়ছিল, বাইরে থেকে যেদিন একটা প্রবল বিরুদ্ধ শক্তি সেই ভেতরের ভাঙ্গনের সুযোগ গ্রহণ করে সমস্ত দেশটার চেহারা বদলাতে চলেছিল, সেই সময় চৈতন্যদেব আচণ্ডাল সকল মানুষকে মানবতার সহজ অধিকারে আহ্বান করে এক মহান্ ধর্ম্ম-বিপ্লব নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর সেই বিপ্লবের অগ্রদূত—জয়দেব কবি এবং তাঁর রচিত অমরকাব্য গীতগোবিন্দ। গীতগোবিন্দের অক্ষরে অক্ষরে, তার সুরে, তার ছন্দে জয়দেব কবি সর্ব্বগ্লানি-শোধক প্রেমের যে পাবক শক্তির উদ্দীপন করলেন, চূর্ণ-বিগ্রহ জীবনের মন্দিরে প্রেমের অমর দেবতার যে নব-আরতি করলেন, তার প্রভাবে সেদিন বাংলার বিভ্রান্ত জনমানসে এক নতুন চেতনা জেগে ওঠে। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে গীতগোবিন্দের প্রভাব বুঝতে হলে, জয়দেবের সময়কার বাংলার জাতীয় ও সামাজিক জীবনের চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার।
রাজনৈতিক পরাধীনতায় বাংলার জাতীয় জীবন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। পরাধীনতা বহু জাতির ভাগ্যে ঘটে কিন্তু সেই সময়কার পরাধীন বাংলার ছবি দেখলে বোঝা যায় যে, যে-জাতির সামাজিক জীবনে ব্যক্তিগত চরিত্রের মূল্য ও মর্য্যাদা নষ্ট হয়ে যায়, সে-জাতির পুনরুদ্ধারের আর কোন আশা থাকে না। একটা সমগ্র জাত তখন ধীরে ধীরে নির্বীর্য্যতার খাদের শেষতলের দিকে গড়িয়ে চলেছিল। এবং এই জাতীয় চরিত্রের অধোগতির সব চেয়ে বড় লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে যৌন-বিকারে ও ব্যভিচারে।
জীবনের আর সব ক্ষেত্র থেকে সরে এসে, ধর্ম্মের আড়ালে তখনকার বাঙালীরা নিছক কামচর্চ্চা ও যৌন-লিপ্সার মধ্যে ডুবে ছিল। সমাজের উচ্চস্তরে চলেছিল তন্ত্র-সাধনার বিকৃতির ফলে নারী-মাংসের পংক্তি-ভোজন, সমাজের নিম্নস্তরে কোন আড়ালেরই প্রয়োজন ছিল না, প্রকাশ্য দিবালোকে পথেঘাটে চলতো সুরামত্তের আর বারাঙ্গনার দ্বৈতনৃত্য। যে-নদীয়ায় আসেন চৈতন্যদেব, সেই নদীয়ার গঙ্গার ঘাটে ঘাটে বসতো সুরাপায়ীদের আসর, বারাঙ্গনাদের উৎসব-সভা। এই যৌন-বিকার ও ইন্দ্রিয়-আসক্তির নির্লজ্জ প্রসারে ডুবে যেতে বসেছিল জাতির চেতনা। সেই সময় জয়দেব তাঁর অমর সঙ্গীতের ঝংকারে নিয়ে এলেন প্রেমের পাবক বাণী, মানব-জীবনের সামনে তুলে ধরলেন সঞ্জীবনী সুধা। তাঁর চরম বৈশিষ্ট্য হলো, এই আদর্শ তিনি তত্ত্বকথা বা উপদেশের ইষ্টকরূপে বিভ্রান্ত জনতার ওপর নিক্ষেপ করলেন না। জগতের শ্রেষ্ঠ কবি ও শিল্পীদের মত তিনি অন্তর থেকে জানতেন, যে-পিপাসায় বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ নিজের হাতে বিষ-পাত্র গ্রহণ করে, সে-পিপাসা মানুষের জীবনে একান্ত সত্য। সেই পিপাসার একমাত্র তৃপ্তি হলো, রসের আস্বাদনে। তাই