চিত্রে জয়দেব
বিস্ময়ে স্বরূপ জিজ্ঞাসা করে,—হাঁ ভাই! এ দশা তোমার কে করলো?
জেলে বলে,—প্রভু, সাগরে জাল ফেলি, মাছ তুলি, বাজারে বেচি, খাই। কাল ভোর রাতে সাগরে জাল ফেলে পেয়ে গিয়েছি সোনার পাহাড়। জল থেকে আর জাল টেনে তুলতে পারি না, এত ভারী। মনে বড় আনন্দ হলো, না জানি কত মাছ আজ জালে পড়েছে। টেনে তুলে দেখি, হরি হরি, এক তাল কাঁচা সোণা গো……কাঁচা সোণার ঠাকুর গো……আমার জালের ভেতর বসে মৃদু মৃদু গাইছে হরিনাম……কোন জ্ঞান নেই, কোন চেতনা নেই, শুধু বলে, কৃষ্ণ কৃষ্ণ! কৃষ্ণ!
স্বরূপ চীৎকার করে ওঠে,—কোথায় ভাই তোমার সেই সোণার ঠাকুর!
জেলে ভক্তদের বাড়ীতে নিয়ে আসে। সমস্ত ধীবর-পল্লী থেকে উঠছে নামগান। জেলের উঠোনের একধারে বসে মহাপ্রভু গেয়ে চলেছেন কৃষ্ণনাম আর তাঁকে ধিরে ধীবর-পল্লীর যত নর-নারী আকুল হয়ে গেয়ে চলেছে সেই মধুর নাম।
বহু চেষ্টাচরিত্রের পর স্বরূপ দামোদর প্রভুর জ্ঞান ফিরিয়ে আনেন, সারাপথ হরিনামে মুখরিত করে তাঁকে নিয়ে ফিরে আসেন গম্ভীরায়।
কোন কোন চরিতকার বলেন, মহাপ্রভু আবার আর একদিন পূর্ণিমার রাত্রিতে সমুদ্রের নীলরূপে তাঁর প্রিয়তমের দর্শন পেয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়েন। এবং সমুদ্রের অতল-নীলে অদৃশ্য হয়ে যান।
মহাপ্রভু ছিলেন ভগবানেরই অবতার। তাঁর স্পর্শে লোকে পেতো চিরানন্দের স্বাদ! তবে তিনি কেন এমনভাবে ভগবৎ-বিরহে কাঁদতেন?
তিনি যে মহাবস্তু পেয়েছিলেন,—তাকে পাবার পথ দেখিয়ে দেবার জন্যেই তিনি তাঁর শেষ জীবনে এই বিরহ-লীলা প্রকট করেন। এই ঐকান্তিক বিরহের ভেতর দিয়েই শ্রীমতী তাঁর পরমেশ্বরকে তাঁর পরম-ঈপ্সিতকে পেয়েছিলেন, এই বিরহ-সাধনার ভেতর দিয়েই আমরা সাধারণ মানুষ পেতে পারি সেই পরমেশ্বরের সন্ধান। বৈষ্ণবকবিরা তাই এমন করে গেয়ে গিয়েছেন এই বিরহের গান। এই বিরহ বিচ্ছেদ নয়, এই বিরহই হলো প্রেমের আরতি।
গীতগোবিন্দ হলো এই প্রেমেরই আরতি, ছন্দে, ভাষায়, সুরে।