বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:ছাতাচূড়া আর বড়াইলের গল্প - জগন্নাথ চক্রবর্তী (২০০৫).pdf/১৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

ছিল না। কিন্তু হাফলঙে এসে এখন ভোর চারটের আগেই ঘুম থেকে উঠি—বড়াইলের সূর্য ওঠার অতুল্য দৃশ্যটি দেখার জন্যই।

 ব্রাহ্ম মুহূর্তের আগে এখনকার আবর্তভবনের উঠোনে দাঁড়াই। সম্মুখের খাদ ডিয়ুং নদী সংপিজাং বসতি পাহাড়মালার বুক অব্দি ধবধবে দুধ সাদা মেঘে ঢাকা। যেন সাদা মেঘের তরল সমুদ্র। সম্মুখে অনেকদূর, ডানে-বামে বড়াইল পাহাড় মালার চূড়া জেগে আছে। দখিন দিক অর্থাৎ জাটিংগা থেকে মেঘ জলের স্রোতের মতো ধেয়ে এসে আমাকে ধুয়ে দিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে উত্তরে। পার হয় ব্রাহ্ম মুহূর্ত আসে ভোর। পূর্বাশা রক্তাক্ত হয়। লাল হয় পাহাড়ের চূড়া। জেগে ওঠে সূর্য প্রকৃতির আত্মাকে রাঙিয়ে। এ যেন কৈশোরের স্বভাবসুন্দর ঐশ্বর্য নিয়ে পৃথিবীর জেগে ওঠা—এক স্বপ্নময় মায়াময় নতুনের অভ্যুত্থান ।

 সূর্য ওঠা আর সূর্য ডোবার দৃশ্য আমাকে কেমন মজিয়ে দেয়। দিনের যে-কোনো সময় বড়াইলের দিকে তাকালেই সাদা মেঘের ওড়াওড়ি—স্বপ্নলোকের পরিদের মতোন। মনে হয় সেই কালিদাসের কাল; সেই মেঘদূতের বিরহী যক্ষের কথা;

 ‘মেঘালোকে ভবতি সুখিনোহপ্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ  প্রিয়ার সঙ্গে থেকেও মেঘে দেখলে মন কেমন করে ওঠে।

 হাফলঙের শহর বলতে বেশ কিছু রেলবিভাগের ঘরবাড়ি, গ্রোভল্যান্ড, জেলাপরিষদের পুরোনো বাড়ি, থানা আর বাজার। লোকজন একেবারেই কম।

 আমাকে প্রায়ই কাজের দিনে হাফলং হিল স্টেশন বা জাটিংগা স্টেশনে যেতে হয়। যাতায়াতের সময় দারুচিনির গাছের নিচে দাঁড়াই। এক ঝাঁক ময়না পাখির কলকাকলি শুনি। সামনের পরের বাঁকে টিলায় বেশ কিছু নাসপাতি আর কমলা গাছ। নিচের সংপিজান বসতিতে দু-চারটি ঘরবাড়ি। রহস্যময় সুড়ঙ্গ পার হয়ে যাওয়া আসা করে ট্রেন। এক অপরিচিত অজানা দেশের সন্দেশ নিয়ে।

 দারুচিনি গাছটা পেরোতেই টিলার গায়ে একখানি ছোট্ট ছনবাঁশের ঘর। ঘরের বাইরে দড়িতে হলুদ-সবুজ রঙের একখানা রিগু মেলা থাকে। কোনো ডিমাসা পরিবারই হবে। ঘরটির সঙ্গে বা কাছাকাছি কোনো ঘরবাড়ি নেই। ওরা যেন পৃথক রাজ্যের বাসিন্দা। কিন্তু কোনোদিন কোনো মানুষের সাড়া পাইনি। তার ওপর বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে কয়েকটি নাসপাতি, আমলকী আর পিসফলের গাছ। একটি বড়ো মুরগি সঙ্গে অনেকগুলি ছানা নিয়ে চরে। এই পথেই কতদিন বনরুই আর চিতার বাচ্চা দেখেছি। যেতে আসতে প্রায়ই এই দ্বীপের মতো একাকী বাড়িটি আমার নজর কাড়ে। আমার কেবলই মনে হয়, একটু নেমেই দেখি বাড়িতে কারা থাকে। তবু কেন জানি না, দেখা আর হয়ে ওঠে না।

 সেদিনটি আষাঢ়ের শেষ সপ্তা, শেষ শনিবার। হাফলঙের বাজারবার। বাইরে দানাদানা বৃষ্টি। আকাশে ভাঙা ভাঙা জোছনা। পাহাড়ি অঞ্চলকে কেমন রহস্যময় করে তুলেছে। হাফলং হিল থেকে পায়ে হাঁটা ছোট্ট আঁকাবাঁকা পথে উঠে আসছি