পাতা:জননী - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়.pdf/২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

জননী

২৩

 শ্যামা হাসে: ঠাকুরঝি যেন কি! সায়েবদের ছেলেরা পরে দ্যাখোনি?

 তুমি যেন কত দেখেছ!

 দেখিনি! গড়ের মাঠে চিড়িয়াখানায় কত দেখেছি!

 ও, কত তুমি বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ গড়ের মাঠে চিড়িয়াখানায়!

 না ঠাকুরঝি, ঠাট্টা না, আগে সত্যি নিয়ে যেত, চার পাঁচবার গিয়েছি যে। সায়েবদের কচি কচি ছেলেদের এমনি জামা পরিয়ে ঠেলা গাড়িতে করে আয়ারা বেড়াতে আনত। এমন সুন্দর ছেলেগুলি চুরি করে আনতে সাধ হত আমার।

 পুরানাে কাঁথার উপর শ্যামা নূতন কাঁথা বিছায়, ছেলের গায়ের তৈলাক্ত পেনিটি খুলিয়া বিষ্ণুপ্রিয়ার দেওয়া আলখাল্লা পরায়। তারপর একখানা তোয়ালে জড়াইয়া শােয়াইয়া দেয়। আনন্দে অভিভূতা হইয়া শ্যামা বলে কি রকম দেখাচ্ছে দ্যাখাে ঠাকুরঝি!

 মন্দা হাসিমুখে সায় দিয়া বলে, খাসা দেখাচ্ছে বৌ। ওমা মুখ বাঁকায় যে!

 ছেলেকে শ্যামা সত্যসত্যই পুঁটুলি করিয়াছে। হাত পা নাড়িতে না পারিয়া সে হাঁপাইয়া কাঁদিয়া ওঠে। তােয়ালেটা শ্যামা তাড়াতাড়ি খুলিয়া লয়। মন্দা শিশুকে কোলে লইয়া বলিতে থাকে, অ সােনা, অ মাণিক —তােমায় বেঁধেছিল, শক্ত করে বেঁধেছিল, মরে যাই! শ্যামার গায়ে কাঁটা দেয়, মাথা দুলাইয়া ঝোঁক দিয়া দিয়া মন্দা বলিতে থাকে, মেরেছে? আমার ধনকে মেরেছে? কে মেরেছে রে! আ লাে আ লাে—ন ন ন

 শ্যামা উত্তেজিত হইয়া বলে, ও ঠাকুরঝি ও যে হাসলাে!

 মন্দা দেখিতে পায় নাই। তবু সে সায় দিয়া বলে, পিসীর আদরে হাসবে না?

 কি আশ্চর্য কাণ্ড ঠাকুরঝি! ওইটুকু ছেলে হাসে!

 এবকম আশ্চর্য কাণ্ড দিবারাত্রিই ঘটিতে থাকে। খােকার সম্বন্ধে এবার সে কিনা অনেক বিষয়েই উদাসীন থাকিবে ঠিক করিয়াছে, খােকার আশ্চর্য কাণ্ডগুলিতে অনেক সময় শ্যামা শুধু তাই মনে মনে আশ্চর্য হয়, বাহিরে কিছু প্রকাশ করে না। খােকার হাত পা নাড়িয়া খেলা করা দেখিয়া