বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:জল ও হিজল - এনামূল হক পলাশ (২০১৯).pdf/৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

ঘাসের ভেতরে গেরিলার মুখোমুখি

সন্তের মতো উচ্চারণ— ‘জ্বরের ভেতর দিয়ে যাও’। আধুনিক মানুষের দহনপৃষ্ট হৃদয়ে কত গান যে কত সুরে বাজে, রঙতুলির কত যে স্ট্রোক—এতে মাঝেমধ্যে জব্দ হয়ে পড়ি। কেউ তার সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে আমাকে ঘা দিতে পারলে আমি বর্তে যাই। আমি চাই, আমার ক্ষত আরও বাড়ুক। ক্ষত সঙ্গে নিয়ে হাঁটি, খাই, ঘুমাই, অফিস করি। কখনও কখনও দেখি— মনের অজান্তে হাত চলে গেছে ক্ষতস্থানে, হাত বুলাচ্ছি। এই আমার সঞ্চয়, এই আমার পাথেয়। কবি এনামূল হক পলাশও আমাকে টেটাবিদ্ধ করলেন। সে জন্য তাকে অনিঃশেষ ধন্যবাদ।

এনামূল হক পলাশ আধুনিকতায় ঋদ্ধ হয়েও শ্রেণিবোধ, প্রকৃতি, লোকাচার ও জল-মাটি-মানুষের বাস্তবতা জারি রাখেন তার কবিতায়। জল ও হিজল এর পাণ্ডুলিপি পাঠপ্রতিক্রিয়ায় বলব, তার অন্তঃসংবেদী অন্তরঙ্গতাপূর্ণ সহজ কাব্যভাষাভঙ্গি আমাকে টেনেছে। পলাশ তার কবিতায় আমাদের অতি পরিচিত সমাজ-জগতের নানা অসঙ্গতি, অসাধুতার ছবি তুলে ধরেছেন— যা প্রতিবাদমুখর উচ্চারণে উচ্চকিত না হয়েও সূক্ষ্ম স্যাটায়ার ও প্রকাশভঙ্গির ঋজুতায় তথাকথিত প্রতিষ্ঠানের পিঠ চাপকে দেয়। আমাদের রাজনীতি দুর্গন্ধময়। তবু কবি লিখেন- 'সিগারেটের চেয়ে বিড়ি/ বিড়ির চেয়ে হুক্কা কিছুটা সমাজতান্ত্রিক।' অতি শান্ত-ধীর উচ্চারণে খাঁটি বাঙালিয়ানার ‘হুক্কা’ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের (সিগারেট) ওপর হামলে পড়ল যেন। এই হলো কবি এনামূল হক পলাশের প্রতিবাদী চেহারা।

এদিকে এই কবির বন্ধু-শিক্ষক হচ্ছে গাছসহ প্রকৃতির কত চরিত্র, যার ইয়ত্তা নেই। কখনও তিনি গাছ হয়ে যান, প্রাণিজগতের অন্য বস্তুর ভেতরে ঢুকে যান। আসলে এদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান তিনি। তারপর অবলোকন করেন নিজেকে, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জগৎকে। গাছের চোখে দেখেন- “আঘাত পেলে আম গাছের শরীর বেয়ে/ ফোটা ফোটা দুঃখ নেমে আসে।' প্রকৃতি ও মানুষের আন্তঃযোগাযোগের এজমালি পথটির কথা অনেক হতভাগ্যের মতো ভুলে যাননি তিনি। প্রকৃতিদর্শনই একজন শিল্পীর মূল শক্তি। এই ভঙ্গুর, মনোটোনাস নগরজীবনে কবি এনামূল হক পলাশের শক্তি এখানেই।

মাহবুব কবির

জল ও হিজল
ভূমিকা