পাতা:জাপানে-পারস্যে-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১১৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
১০৪
জাপানে-পারস্যে

 কলকাতার বাহিরের পল্লীগ্রাম থেকে যখন বেরলুম তখন ভােরবেলা। তারাখচিত নিস্তব্ধ অন্ধকারের নিচে দিয়ে গঙ্গার স্রোত ছলছল করছে। বাগানের প্রাচীরের গায়ে সুপুরি গাছের ডাল দুলছে বাতাসে, লতাপাতা ঝােপঝাপের বিমিশ্র নিঃশ্বাসে একটা শ্যামলতার গন্ধ আকাশে ঘনীভূত। নিদ্রিত গ্রামের আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ গলির মধ্য দিয়ে মােটর চলল। কোথাও বা দাগধরা পুরােনাে পাকা দালান, তার খানিকটা বাসযােগ্য, খানিকটা ভেঙেপড়া; আধা-শহুরে দোকানে দ্বার বন্ধ; শিবমন্দির জনশূন্য, এবড়াে-খেবড়াে পােড়াে জমি; পানাপুকুর; ঝােপঝাড়। পাখিদের বাসায় তখনাে সাড়া পড়ে নি, জোয়ার ভাঁটার সন্ধিকালীন গঙ্গার মতাে পল্লীর জীবনযাত্রা ভােরবেলাকার শেষ ঘুমের মধ্যে থমকে আছে।

 গলির মােড়ে নিষুপ্ত বারান্দায় খাটিয়া-পাতা পুলিসথানার পাশ দিয়ে মােটর পৌঁঁছল বড়াে রাস্তায়। অমনি নতুন কালের কড়া গন্ধ মেলে ধুলাে জেগে উঠল, গাড়ির পেট্রোল বাষ্পের সঙ্গে তার সগােত্র আত্মীয়তা। কেবল অন্ধকারের মধ্যে দুই সারি বনস্পতি পুঞ্জিত পল্লবস্তবকে প্রাচীন কালের নীরব সাক্ষ্য নিয়ে স্তম্ভিত; সেই যে-কালে শতাব্দীপর্যায়ের মধ্যে দিয়ে বাংলার ছায়াস্নিগ্ধ অঙ্গন পার্শ্বে অতীত যুগের ইতিহাসধারা কখনাে মন্দ গম্ভীর গতিতে কখনাে ঘূর্ণাবর্তসংকুল ফেনায়িত বেগে বয়ে চলেছিল। রাজপরম্পরার পদচিহ্নিত এই পথে কখনাে পাঠান, কখনাে মােগল, কখনাে ভীষণ বর্গী, কখনাে কোম্পানির সেপাই ধুলাের ভাষায় রাষ্ট্রপরিবর্তনের বার্তা ঘােষণা করে যাত্রা করেছে। তখন ছিল হাতী, উট, তাঞ্জাম, ঘােড়সওয়ারদের অলংকৃত ঘােড়া; রাজপ্রতাপের সেই সব বিচিত্রবাহন ধূলাের ধূসর অন্তরালে মরীচিকার মতাে মিলিয়ে গেছে। একমাত্র বাকি আছে সর্বজনের ভারবাহিনী করুণ মন্থর গরুর গাড়ি।

 দম দম-এ উড়ােজাহাজের আড্ডা ওই দেখা যায়। প্রকাণ্ড তার