উপরে সমাসীন—আলোকস্তম্ভের মত সৈন্যরাজির মধ্যস্থলে যুবরাজ দারা শুকো সমস্ত মানবের দৃষ্টিগোচর হয়েছিলেন।
উঃ! যুবরাজ দারার পরাজয়ের দুঃসংবাদ আগ্রার দুর্গে প্রচারিত হল, আমি আকুল ক্রন্দন করলাম, কেবল ক্রন্দন। সে ক্রন্দন আজও আমার শেষ হয়নি। কি ভীষণ দুর্ভাগ্য আমার ভ্রাতার! আমি তাঁর নাম পর্য্যন্ত উচ্চারণ করতে পারি নি। যুবরাজ দারা! তোমার প্রাণে ছিল অপূর্ব্ব মহিমা। তোমার অন্তরে ধ্বনিত হত সম্রাট আকবরের মিলনের সুর। একই ভগবান যেমন জগতের ভাগ্যবিধাতা, তেমনি একই বিধান সমগ্র বিশ্বের নিয়ন্তা। যুবরাজ দারা। তোমার ছিল দুর্ব্বলতা, তোমার ছিল অহঙ্কার। অহঙ্কারই রচনা করল তোমার পতন! তোমার বিরুদ্ধ দলের ছিল শক্তি, আওরঙ্গজেবের ছিল কৌশল।
তোমাকে আমি ঘৃণা করি, হে খলরাজ আওরঙ্গজেব! তোমাকে আমি ভীষণ ঘৃণা করি। তোমার প্রতিভা যেমন তীব্র, তোমার হৃদয় তেমনি কঠিন। তোমার একমাত্র চিন্তা—তুমি হবে ভারতের একচ্ছত্র সম্রাট, তুমি হবে মানুষের দেহমন দুটিরই অধীশ্বর! তোমার নয়নে ভাসছে অপূর্ব্ব সম্মিত হাসি, আর তোমার পদতলে দলিত হচ্ছে— তোমার বিরুদ্ধচারী শত্রু। মনে পড়ে তোমার? শৈশবের সেই পরিব্রাজকের ভবিষ্যৎ বাণী[১]?
- ↑ কথিত আছে যে, একজন পরিব্রাজক মুঘলরাজবংশধরদের হস্ত পরীক্ষা করে সমস্ত রাজকুমারদের ভবিষ্যৎ বলেছিলেন। আওরঙ্গজেবকে বলেছিলেন—তুমি হবে তৈমুরবংশের বিনাশকর্তা। মুঘল রাজগণ জ্যোতিষ শাস্ত্র ও সামুদ্রিক বিচার বিশ্বাস করতেন। এমন কি যুদ্ধযাত্রার পূর্ব্বে নক্ষত্রের গতির উপর সৈন্যচালনা নির্ভর করত। রাজবংশের সমস্ত সন্তানের জন্ম কুণ্ডলী ও কোষ্ঠী তৈরী করা হত।
রাজোপহারের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল। পরাজিত শত্রুর সম্পদের মধ্যে হস্তী সম্রাটের অবশ্য প্রাপ্য ছিল। আকবরের হস্তীর নাম ছিল ফিল্-ই-ইলাহি (আল্লাহ্র হস্তী), জাহাঙ্গীরের হস্তীর নাম নুর-ই-ফিল্ (হস্তীর আলো) দারাশুকোর হস্তী ছিল ফতেজঙ্গ (যুদ্ধ বিজয়ী)।