বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:জাহানারার আত্মকাহিনী - মাখনলাল রায়চৌধুরী.pdf/২০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জাহানারার আত্মকাহিনী

 আওরঙ্গজেব, আজ রজনীতেও আমি বেঁচে আছি—আমি চিন্তা করতে পারছি। আমি নীরবে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তোমাকে আমার বার্ত্তা প্রেরণ করছি, মৃত্যুর রাজ্য অতিক্রম করে আমার বার্ত্তা তোমার নিকট পৌঁছবে। আজ নিশীথে এক গুপ্ত শক্তি আমার ইন্দ্রিয়গ্রামকে আচ্ছন্ন করেছে.....

 ঘনকৃষ্ণ ছায়ারাশি মাটির উপরে ভেসে আসছে, তুমি বোধ হয় দেখতে পাচ্ছ না। আমি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি, ঐ কালো ছায়া মূর্ত্তি—কুব্জ পৃষ্ঠ নুব্জ দেহ—হঠাৎ সে ছায়া মূর্ত্তিগুলি এক সঙ্গে আকাশে উঠছে, ঐ যে সেই মূর্ত্তি মেঘে রূপান্তরিত হচ্ছে, তারপর ঝঞ্ঝা, ঐ দেখ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, অগ্নির লেলিহান শিখা উঠেছে, সমস্ত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কুব্জ পৃষ্ঠ থেকে তোমার শৃঙ্খল খসে পড়বে। ভীষণ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সম্রাট আকবরের স্বপ্ন—তৈমুর বংশের ছত্রাধীনে অখণ্ড ভারতের স্বপ্নবিলীন হয়ে যাবে।

 আওরঙ্গজেব! আমি ভবিষ্যৎ বাণী করছি—হে শক্তিমান্, তুমি ভগবানকে ভয় কর, তাঁকে ভালবাস না। তোমাকেও মানুষ ভয় করবে, ভালবাসবে না; সম্রাট আকবর যখন একখণ্ড তাম্রমুদ্রা দান করতেন, সে মুদ্রা স্বর্ণ-খণ্ডে পরিণত হয়ে যেত। কিন্তু তুমি যা’ দান কর, তা’ কণ্টকে পরিবর্ত্তিত হয়ে উঠে। সম্রাট আকবর মিলনের প্রয়াস করেছিলেন—আর

    গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দী করা হত। গোয়ালিয়র দুর্গ অনেকটা ইংলণ্ডের টাওয়ার অব লগুন অথবা ফরাসীদেশের বাস্তিল দুর্গের মত। মুঘল রাজবংশের সন্তানদের অনেক সময় হত্যা না করে স্বল্প মাত্রায় আফিঙের জল পান করতে দেওয়া হ’ত। আফিঙের বিষ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তার বুদ্ধিভ্রংশ করে দিত, ক্রমশঃ তার অনুভূতি অস্পষ্ট হয়ে যেত। আফিঙ-বিষে জর্জ্জরিত মানুষের জীবন মৃত্যু অপেক্ষাও কষ্টদায়ক। তুর্ক জাতির মধ্যেও এই আফিঙ-বিষ প্রয়োগের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তুরস্কে ওসমানালী বংশে প্রবাদ প্রচলিত ছিল—রাজকুলের কোন আত্মীয় নেই। একাধিক ভ্রাতার জন্ম রাজকুলে অমঙ্গল বলে বিবেচিত হত।