বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:জাহানারার আত্মকাহিনী - মাখনলাল রায়চৌধুরী.pdf/২১

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জাহানারার আত্মকাহিনী

তুমি ধ্বংসের অভিযান করে চলেছ। আমি তোমাকে অভিসম্পাত করছি—আওরঙ্গজেব! তুমি তোমার পিতার প্রতি যে ব্যবহার করেছ তা’ তুমি সমস্ত জীবনে ভুলতে পারবে না; তুমি যে পথে চলবে, সমস্ত জীবন ধরে সে পথে তোমার ছায়া তোমাকে অতিক্রম করে যাবে, তোমাকে বিপথে পরিচালিত করবে। পবিত্র কোরাণের কোন বাণী তোমাকে তোমার ছায়ার আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে পারবে না।

 হিন্দুস্থান আজ বিজেতার ক্রীতদাসী। কখনো লোভে, কখনো ঘৃণায় হিন্দুস্থান লুণ্ঠিত হয়েছে। যদি কোন বিরাটের প্রেরণা নিয়ে ভারতের রাষ্ট্র পরিচালনা করা হ’ত তবে ভারতবর্ষ নিশ্চয় তার সমস্ত সন্তানের জননী হতে পারত। আজও হয়ত দিল্লীর প্রাসাদে ময়ূর সিংহাসন নিজের উজ্জ্বলতায় শোভা পাচ্ছে, কিন্তু সিংহাসনের মণিমাণিক্য দূর থেকে আহ্বান করছে বিপদ—যেমন চুম্বক আহ্বান করে লৌহকে।

 দূর থেকে আসছে এক শীতল প্রভঞ্জন। আমি শিউরে উঠ্‌ছি, সে হচ্ছে ঝঞ্ঝার ইঙ্গিত রক্তসমুদ্রের দূত। শক্তিশালী সম্রাটের পদতলে লুণ্ঠিত হয় রাজ্যের বিধান, রক্তপ্রবাহ মুছে নিয়ে যায় সে পদচিহ্ন। রাত্রিতে শুনতে পাচ্ছি সমস্ত দিল্লীব্যাপী এক বিরাট ক্রন্দন রোল— যেমন উঠেছিল আর একবার তৈমুরের দিল্লী অভিযানের দিনে। আর একবার উঠ্‌ছে পাণিপথের প্রবল ঝড়।

 মৃত মানবই একমাত্র শান্তির অধিকারী—না না, তারাও নয়। ধনরত্ন লোভে কি মৃত্যুর সমাধি অমানিত হয় নি? আমি কিন্তু মূল্যবান প্রস্তর অথবা মর্ম্মরদেবীর নিম্নে সমাধিস্থ হতে চাই না, একমাত্র তৃণই হবে আমার সমাধির আবরণ! যদি কোনদিন চরণাঘাতে দলিত হয়, তবু তৃণখণ্ড আবার নতুন হয়ে জন্মাবে।

 ভগবান পদদলিতকে কোলে তুলে নেন।