বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:জাহানারার আত্মকাহিনী - মাখনলাল রায়চৌধুরী.pdf/২৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জাহানারার আত্মকাহিনী
১১

সাম্রাজ্যের মঙ্গলের জন্য সম্রাট আকবর মুঘল রাজকুমারীকে উৎসর্গ করেছিলেন।

 দূরে ঐ প্রাসাদের অপর প্রান্তে গিরিশিখরে আর একটি ক্ষুদ্র প্রাসাদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। সেই প্রাসাদের শুভ্র মর্ম্মর তোরণ আর সুবর্ণখচিতদ্বার ঐ শান্ত জলরাশির উপর প্রতিফলিত হচ্ছে। জলধারার অন্তরে বাহিরে অপার নিস্তব্ধতা। কারণ, আজ তাঁর সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু সেই প্রাসাদের অভ্যন্তরে তাঁকে বেষ্টন করে আমি রচনা করতাম আমার রাজসভা। সেই সভায় মুঘল রাজকুমারীর ভোজউৎসবে স্বর্গের দেবতারা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠতেন। সে ভোজন কক্ষে সুশীতল মর্ম্মর শিলাতলে নর্ত্তকীর নুপূরনিক্কণ কম্পন জাগাত। ভোজনের অবসরে রত্নখচিত পাত্রে কাবুল কাশ্মীরের সুরাধারা চিন্তার স্রোতকে স্তব্ধ করে দিত। না, না, আমি আমার ভ্রাতা দারার স্বপ্ন সফল করে দিতাম। হিন্দু-মুসলমানের সংস্কৃতি— দু’ধারার মিলন করিয়ে দিতাম। মরমী সুফী সাধু সন্ত যোগীদের প্রেমবারি সিঞ্চন করে অমূল্য সুরাসার[] তৈরী করে দিতাম। সে সুরা রূপ নিত কাব্যের ঝঙ্কারে, ভাষার মূর্চ্ছনায়। মনে পড়ে একদিন সম্রাট আকবরের রাজসভায়......

 ঐ শোন স্রোতস্বিনীর বুকে জলের স্বল্প কলতান—অঙ্গুরীবাগের পাশ দিয়ে চলেছে যমুনার স্বচ্ছ শ্রান্ত জলধারা। পত্রমর্ম্মর শুনতে পাচ্ছি। আজ আমার কর্ণে এই শান্ত করুণ শব্দ দিল্লীর নহবৎখানার ঐক্যতানের মত মুখর হয়ে উঠেছে! এই স্রোতস্বিনীর তানে আমার কাছে ফিরে আসছে ফিরোজসাহের পরিখার পাশে আমার উদ্যানবাটিকার পুরাতন স্মৃতি। ঐ করতালের কলরোল, ঐ বীণার ঝঙ্কার আজ যমুনার জলে ভেসে এসে আমার দিবাবসানে শ্মশানের চিতার ধূমশিখা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ঐ দিল্লীর প্রাসাদের ঐক্যতান সঙ্গীত যেন আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় মানুষের আর্ত্তনাদ—আমার অভিশাপের ভগ্নদূত।


  1. সুফী পরিভাষায় “সুরা” প্রেমের অপর নাম।