পাতা:জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা.djvu/১৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।

মাঝপথে থেমে গেল তা'রা সব;
শকুনের মতো শূন্যে পাখা বিথারিয়া
দূরে—দূরে—আরো দূরে—আরো দূরে চলিলাম উড়ে,
নিঃসহায় মানুষের শিশু একা—অনন্তের শুক্ল অন্তঃপুরে
অসীমের আঁচলের তলে
স্ফীত সমুদ্রের মতো আনন্দের আর্ত কোলাহলে
উঠিলাম উথলিয়া দুরন্ত সৈকতে—
দূর ছায়াপথে।
পৃথিবীর প্রেতচোখ বুঝি
সহসা উঠিল ভাসি তারকাদর্পণে মোর অপহৃত আননের প্রতিবিম্ব খুঁজি;
ভ্রূণভ্রষ্ট সন্তানের তরে
মাটি-মা ছুটিয়া এলো বুকফাটা মিনতির ভরে;
সঙ্গে নিয়ে বোবা শিশু—বৃদ্ধ মৃত পিতা,
সূতিকা-আলয় আর শ্মশানের চিতা,
মোর পাশে দাঁড়ালো সে গর্ভিণীর ক্ষোভে;
মোর দুটি শিশু আঁখি-তারকার লোভে
কাঁদিয়া উঠিল তার পীনস্তন—জননীর প্রাণ;
জরায়ুর ডিম্বে তার জন্মিয়াছে যে ঈপ্সিত বাঞ্ছিত সন্তান
তার তরে কালে-কালে পেতেছে সে শৈবালবিছানা শালতমালের ছায়া,
এনেছে সে নব-নব ঋতুরাগ—পউষনিশির শেষে ফাগুনের ফাগুয়ার মায়া;
তার তরে বৈতরণীতীরে সে যে ঢালিয়াছে গঙ্গার গাগরী,
মৃত্যুর অঙ্গার মথি স্তন তার ভিজে রসে উঠিয়াছে ভরি,
উঠিয়াছে দূর্বাধানে শোভি,
মানবের তরে সে যে এনেছে মানবী;
মশলাদরাজ এই মাটিটার ঝাঁঝ যে রে—
কেন তবে দু-দণ্ডের অশ্রু অমানিশা
দূর আকাশের তরে বুকে তোর তুলে যায় নেশাখোর মক্ষিকার তৃষা!
নয়ন মুদিনু ধীরে—শেষ আলো নিভে গেল পলাতক নীলিমার পারে,
সদ্য-প্রসূতির মতো অন্ধকার বসুন্ধরা আবরি আমারে।

১৬