পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৬২ জীবন-স্মৃতি । ভরাইতে ভাল বাসিতাম। এটাকে বেশ কবিজনোচিত বলিয়া বোধ হইত। তৃণহীন কঙ্করশয্যায় বসিয়া রৌদ্রের উত্তাপে “পৃথীরাজের পরাজয়” বলিয়া একটা বীররসাত্মক কাব্য লিখিয়াছিলাম। তাহার প্রচুর বীররসেও উক্ত কাব্যটাকে বিনাশের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারে নাই। তাহার উপযুক্ত বাহন সেই বাধানে লেটস ডায়ারিটিও জ্যেষ্ঠ সহোদর নীল খাতাটির অমুসরণ করিয়া কোথায় গিয়াছে তাহার ঠিকানা কাহারো কাছে রাখিয়া যায় নাই । বোলপুর হইতে বাহির হইয়া সাহেবগঞ্জ, দানাপুর, এলাহাবাদ, কানপুর প্রভৃতি স্থানে মাঝে মাঝে বিশ্রাম করিতে করিতে অবশেষে অমৃতসরে গিয়া পৌছিলাম। পথের মধ্যে একটা ঘটনা ঘটিয়াছিল যেটা এখনো আমার মনে স্পষ্ট অণকা রহিয়াছে। কোনো একটা বড় ষ্টেশনে গাড়ি থামিয়াছে। টিকিটপরীক্ষক আসিয়া আমাদের টিকিট দেখিল। একবার আমার মুখের দিকে চাহিল। কি একটা সন্দেহ করিল কিন্তু বলিতে সাহস করিল না। কিছুক্ষণ পরে আর একজন আসিল—উভয়ে আমাদের গাড়ির দরজার কাছে উস্থুস করিয়া আবার চলিয়া গেল । তৃতীয়বারে বোধ হয় স্বয়ং ষ্টেশনমাষ্টার আসিয়া উপস্থিত । আমার হাফটিকিট পরীক্ষা করিয়া পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, এই ছেলেটির বয়স কি বারো বছরের অধিক নহে ? পিতা কহিলেন “না” । তখন আমার বয়স এগারো । বয়সের চেয়ে নিশ্চয়ই আমার বৃদ্ধি কিছু বেশি হইয়াছিল। ষ্টেশনমাষ্টার কহিল ইহার জন্য পূরা ভাড়া দিতে হইবে। আমার পিতার দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল । তিনি বাক্স হইতে তখনি নোট বাহির করিয়া দিলেন। ভাড়ার টাকা বাদ দিয়া অবশিষ্ট টাকা যখন তাহার ফিরাইয় দিতে আসিল তিনি সে টাকা লইয়া ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন, তাহা প্ল্যাটফর্মের পাথরের মেজের উপর ছড়াইয় পড়িয়া ঝন ঝন করিয়া বাজিয়া উঠিল। ষ্টেশনমাষ্টার অত্যন্ত সঙ্কুচিত হইয়া চলিয়া গেল—টাকা বঁাচাইবার জন্য পিতা যে মিথ্যাকথা বলিবেন এ সন্দেহের ক্ষুদ্রতা তাহার মাথা হেঁট করিয়া দিল ।