পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১২৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


হিমালয় যাত্র । \3ר র্তাহার হাতে না দিয়া ঘরের টেবিলের উপর রাখিয়া দিয়াছিলাম, ইহাতে তিনি আমাকে ভৎসনা করিয়াছিলেন । ডাকবাংলায় পৌছিলে পিতৃদেব বাংলার বাহিরে চৌকি লইয়া বসিতেন । সন্ধ্যা হইয়া আসিলে পৰ্ব্বতের স্বচ্ছ আকাশে তারাগুলি আশ্চৰ্য্য সুস্পষ্ট হইয়া উঠিত এবং পিতা আমাকে গ্ৰহতারকা চিনাইয়া দিয়া জ্যোতিষ্কসম্বন্ধে আলোচনা করিতেন । বক্রোটায় আমাদের বাসা একটি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় ছিল। যদিও তখন বৈশাখ মাস, কিন্তু শীত অত্যন্ত প্রবল। এমন কি, পথের যে অংশে রৌদ্র পড়িত না সেখানে তখনো বরফ গলে নাই । এখানেও কোন বিপদ আশঙ্কা করিয়া আপন ইচ্ছায় পাহাড়ে ভ্ৰমণ করিতে পিতা একদিনও অামাকে বাধা দেন নাই । আমাদের বাসার নিম্নবৰ্ত্তী এক অধিত্যকায় বিস্তীর্ণ কেলুবন ছিল। সেই বনে আমি একলা আমার লৌহফলকবিশিষ্ট লাঠি লইয়া প্রায় বেড়াইতে যাইতাম । বনস্পতিগুলা প্রকাণ্ড দৈত্যের মত মস্ত মস্ত ছায়া লইয়া দাড়াইয়া আছে ; তাহদের কত শত বৎসরের বিপুল প্রাণ ! কিন্তু এই সেদিনকার অতি ক্ষুদ্র একটি মানুষের শিশু অসঙ্কোচে তাহদের গা ঘেঁসিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, তাহার একটি কথাও বলিতে পারে না ! বনের ছায়ার মধ্যে প্রবেশ করিবামাত্রই যেন তাহার একটা বিশেষ স্পর্শ পাইতাম । যেন সরীস্থপের গাত্রের মত একটি ঘন শীতলতা, এবং বনতলের শুষ্ক পত্ররাশির উপরে ছায়া-আলোকের পৰ্য্যায় যেন প্রকাণ্ড একটা আদিম সরীসৃপের গাত্রের বিচিত্র রেখাবলী । আমার শোবার ঘর ছিল একটা প্রান্তের ঘর। রাত্রে বিছানায় শুইয়া কাচের জানালার ভিতর দিয়া নক্ষত্রালোকের অস্পষ্টতায় পৰ্ব্বতচূড়ার পাণ্ডুরবর্ণ তুষারদীপ্তি দেখিতে পাইতাম। এক একদিন—জানিনা কতরাত্রে— দেখিতাম পিতা গায়ে একখানি লাল শাল পরিয়া হাতে একটি মোমবাতির সেজ লইয়া নিঃশব্দসঞ্চরণে চলিয়াছেন । কাচের আবরণে ঘেরা বাহিরের বারান্দায় বসিয়া উপাসনা করিতে যাইতেছেন ।