পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৬৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


У о о জীবন-স্মৃতি । দীপ্তিতে জাগিতেছিল। স্বদেশের প্রতি পিতৃদেবের যে একটি আন্তরিক শ্রদ্ধা তাহার জীবনের সকলপ্রকার বিপ্লবের মধ্যেও অক্ষুণ্ণ ছিল তাহাই আমাদের পরিবারস্থ সকলের মধ্যে একটি প্রবল স্বদেশপ্রেম সঞ্চার করিয়া রাখিয়াছিল । বস্তুত সে সময়ট স্বদেশপ্রেমের সময় নয়। তখন শিক্ষিতলোকে দেশের ভাষা এবং দেশের ভাব উভয়কেই দূরে ঠেকাইয়া রাখিয়াছিলেন। আমাদের বাড়িতে দাদার চিরকাল মাতৃভাষার চর্চা করিয়া আসিয়াছেন। আমার পিতাকে তাহার কোনো নূতন আত্মীয় ইংরাজিতে পত্র লিথিয়ছিলেন, সে পত্র লেখকের নিকটে তখনি ফিরিয়া আসিয়াছিল। আমাদের বাড়ির সাহায্যে হিন্দুমেলা বলিয়া একটি মেলা স্বষ্টি হইয়াছিল। নবগোপাল মিত্র মহাশয় এই মেলার কৰ্ম্মকর্তৃণরূপে নিয়োজিত ছিলেন । ভারতবর্ষকে স্বদেশ বলিয়৷ ভক্তির সহিত উপলব্ধির চেষ্টা সেই প্রথম হয়। মেজদাদা সেই সময়ে বিখ্যাত জাতীয় সঙ্গীত “মিলে সবে ভারতসন্তান” রচনা করিয়াছিলেন। এই মেলায় দেশের স্তবগান গীত, দেশানুরাগের কবিতা পঠিত, দেশী শিল্পব্যায়াম প্রভৃতি প্রদর্শিত ও দেশী গুণীলোক পুরস্কৃত হইত। লর্ড কর্জনের সময় দিল্লিদরবারসম্বন্ধে একটা গদ্য প্রবন্ধ লিখিয়াছি— লর্ড লিটনের সময় লিখিয়াছিলাম পদ্যে । তখনকার ইংরেজ গভর্মেন্ট রুশিয়াকেই ভয় করিত, কিন্তু চোদ পনের বছর বয়সের বালক কবির লেখনীকে ভয় করিত না। এই জন্য সেই কাব্যে বয়সোচিত উত্তেজনা প্রভূতপরিমাণে থাকাসত্ত্বেও তখনকার প্রধান সেনাপতি হইতে আরম্ভ করিয়া পুলিসের কর্তৃপক্ষ পৰ্য্যন্ত কেহ কিছুমাত্র বিচলিত হইবার লক্ষণ প্রকাশ করেন নাই। টাইমস্ পরেও কোনো পত্ৰলেখক এই বালকের ধৃষ্টতার প্রতি শাসনকৰ্ত্তাদের ঔদাসীদ্যের উল্লেখ করিয়া ব্রিটিস রাজত্বের স্থায়িত্বসম্বন্ধে গভীর নৈরাশ্য প্রকাশ করিয়া অত্যুষ্ণ দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করেন নাই। সেটা পড়িয়াছিলাম হিন্দুমেলায় গাছের তলায় দাড়াইয়া । শ্রোতাদের মধ্যে নবীন সেন মহাশয় উপস্থিত ছিলেন । আমার বড় বয়সে তিনি একদিন একথা আমাকে স্মরণ করাইয়া দিয়াছিলেন ।