পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৬৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


স্বাদেশিকতা | ) ovరి অন্য সমস্ত অনুষ্ঠানই বেশ ভরপূরমাত্রায় ছিল—আমরা হত আহত পশু পক্ষীর অতিতুচ্ছ অভাব কিছুমাত্র অনুভব করিতাম না। প্রাতঃকালেই বাহির হইতাম। বৌঠাকুরাণী রাশীকৃত লুচি তরকারী প্রস্তুত করিয়া আমাদের সঙ্গে দিতেন । ঐ জিনিষটাকে শিকার করিয়া সংগ্ৰহ করিতে হইত না বলিয়াই একদিনও আমাদিগকে উপবাস করিতে হয় নাই । মাণিকতলায় পোড়োবাগানের অভাব নাই । আমরা যে-কোনো একটা বাগানে ঢুকিয় পড়িতাম। পুকুরের বাধানে ঘাটে বসিয়া উচ্চনীচনির্বিচারে সকলে একত্র মিলিয়া লুচির উপরে পড়িয়া মুহূৰ্ত্তের মধ্যে কেবল পাত্রটাকে মাত্র বাকি রাখিতাম । ব্ৰজবাবুও আমাদের অহিংস্ৰক শিকারীদের মধ্যে একজন প্রধান উৎসাহী। ইনি মেট্রোপলিটান কলেজের সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট এবং কিছুকাল আমাদের ঘরের শিক্ষক ছিলেন । ইনি একদিন শিকার হইতে ফিরিবার পথে একটা বাগানে ঢুকিয়াই মালিকে ডাকিয়া কহিলেন—“ওরে ইতিমধ্যে মামা কি বাগানে আসিয়াছিলেন ?” মালি তাহাকে শশব্যস্ত হইয় প্রণাম করিয়া কহিল “আজ্ঞা না, বাবু ত আসে নাই।” ব্ৰজবাবু কহিলেন “আচ্ছ ডাব পাড়িয়া আন ।” সে দিন লুচির অন্তে পানীয়ের অভাব হয় নাই। আমাদের দলের মধ্যে একটি মধ্যবিত্ত জমিদার ছিলেন। তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দু। তাহার গঙ্গার ধারে একটি বাগান ছিল। সেখানে গিয়া আমরা সকল সভ্য একদিন জাতিবর্ণ-নির্বিবচারে আহার করিলাম। অপরাহ্নে বিষম ঝড়। সেই ঝড়ে আমরা গঙ্গার ঘাটে দাড়াইয়৷ চীৎকার শব্দে গান জুড়িয়া দিলাম। রাজনারায়ণ বাবুর কণ্ঠে সাতটা স্থর যে বেশ বিশুদ্ধভাবে খেলিত তাহা নহে কিন্তু তিনিও গল ছাড়িয়া দিলেন, এবং সূত্রের চেয়ে ভাষ্য যেমন অনেক বেশি হয় তেমনি তাহার উৎসাহের তুমুল হাতনাড়া তাহার ক্ষীণকণ্ঠকে বহুদূরে ছাড়াইয় গেল ; তালের ঝোকে মাথা নাড়িতে লাগিলেন এবং তাহার পাকাদাড়ির মধ্যে ঝড়ের হাওয়া মাতামাতি করিতে লাগিল। অনেক রাত্রে গাড়ি করিয়া বাড়ি ফিরিলাম। তখন ঝড় বাদল থামিয়া তারা ফুটিয়াছে।