পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৮৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিলাত । S > 6. ঘটিয়া থাকে কিন্তু হাওয়াটা একই। পরম্পরের দেখাদেখি যে একই ভাব ছড়াইয় পড়ে তাহা নহে, যেখানে দেখাদেখি নাই সেখানেও অন্যথা হয় না । এই মতটিকে প্রমাণ করিবার জন্য তিনি কেবলি তথ্যসংগ্ৰহ করিতেছেন ও লিখিতেছেন। এদিকে ঘরে অন্ন নাই, গায়ে বস্ত্র নাই । তাহার মেয়েরা তাহার মতের প্রতি শ্রদ্ধামাত্র করে না এবং সম্ভবত এই পাগলামির জষ্ঠ্য র্তাহাকে সৰ্ব্বদা ভৎসনা করিয়া থাকে । এক একদিন তাহার মুখ দেখিয়া বুঝা যাইত—ভাল কোনোএকটা প্রমাণ পাইয়াছেন, লেখা অনেকটা অগ্রসর হইয়াছে । আমি সেদিন সেইবিষয়ে কথা উত্থাপন করিয়া তাহার উৎসাহে আরো উৎসাহসঞ্চার করিতাম, তাবার একএকদিন তিনি বড় বিমৰ্ষ হইয়া আসিতেন—যেন, যে ভার তিনি গ্রহণ করিয়াছেন তাহা আর বহন করিতে পারিতেছেন না । সেদিন পড়ানোর পদে পদে বাধা ঘটিত, চোখ দুটো কোন শূন্যের দিকে তাকাইয়া থাকিত, মনটাকে কোনোমতেই প্রথমপাঠ্য লাটিন ব্যাকরণের মধ্যে টানিয়া আনিতে পারিতেন না । এই ভাবের ভারে ও লেখার দায়ে অবনত তানশনক্লিন্ট লোকটিকে দেখিলে আমার বড়ই বেদন বোধ হইত। যদিও বেশ বুঝিতেছিলাম ই হার দ্বারা আমার পড়ার সাহায্য প্রায় কিছুই হইবে ন—তবুও কোনোমতেই ইহাকে বিদায় করিতে আমার মন সরিল না। যে কয়দিন সে বাসায় ছিলাম এমনি করিয়া লাটিন পড়িবার ছল করিয়াই কাটিল। বিদায় লইবার সময় যখন তাহার বেতন চুকাইতে গেলাম তিনি করুণস্বরে আমাকে কহিলেন—আমি কেবল তোমার সময় নষ্ট করিয়াছি, আমি ত কোনো কাজই করি নাই, আমি তোমার কাছ হইতে বেতন লইতে পারিব না। আমি তাহাকে অনেক কষ্টে বেতন লইতে রাজি করিয়াছিলাম। আমার সেই লটিনশিক্ষক যদিচ তাহার মতকে আমার সমক্ষে প্রমাণসহ উপস্থিত করেন নাই তবু তাহার সে কথা আমি এ পর্যন্ত অবিশ্বাস করি না। এখনে তামার এই বিশ্বাস যে, সমস্ত মানুষের মনের সঙ্গে মনের একটি অখণ্ড গভীর যোগ আছে ; তাহার এক জায়গায় যে-শক্তির ক্রিয়া ঘটে অন্যত্র গুঢ়ভাবে তাহ সংক্রামিত হইয় থাকে।