পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২১১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিলাতী সঙ্গীত । }\లి( শ্রোতাদের মধ্যে র্যাহার রসজ্ঞ তাহারা নিজের মনের মধ্যে নিজের বোধশক্তির জোরেই গানটাকে খাড়া করিয়া তুলিয়া খুসি হইয়া থাকেন ; এই কারণে, তাহারা সুকণ্ঠ গায়কের সুললিত গানের ভঙ্গীকে অবজ্ঞা করিয়া থাকেন ; বাহিরের কর্কশতা এবং কিয়ৎ পরিমাণে অসম্পূর্ণতাতেই আসল জিনিষটার যথার্থ স্বরূপটা যেন বিনা আবরণে প্রকাশ পায় । এ যেন মহেশ্বরের বাহ দারিদ্র্যের মত—তাহাতে র্তাহার ঐশ্বৰ্ঘ্য নগ্ন হইয়া দেখা দেয় । যুরোপে এ ভাবটা একেবারেই নাই। সেখানে বাহিরের আয়োজন একেবারে নিখুৎ হওয়া চাই—সেখানে অনুষ্ঠানে ক্রটি হইলে মানুষের কাছে মুখ দেখাইবার জে থাকে না। আমরা আসরে বসিয়া আধঘণ্টা ধরিয়া তানপুরার কাণ মলিতে ও তবলটাকে ঠকাঠক শব্দে হাতুড়িপেটা করিতে কিছুই মনে করি না । কিন্তু য়ুরোপে এই সকল উদ্যোগকে নেপথ্যে লুকাইয়া রাখা হয়—সেখানে বাহিরে যাহা কিছু প্রকাশিত হয় তাহা একেবারেই সম্পূর্ণ। এইজন্য সেখানে গায়কের কণ্ঠস্বরে কোথাও লেশমাত্র দুর্বলতা থাকিলে চলে না। আমাদের দেশে গান সাধাটাই মুখ্য, সেই গানেই আমাদের যতকিছু দুরূহতা —যুরোপে গলা সাধাটাই মুখ্য, সেই গলার স্বরে তাহারা অসাধ্য সাধন করে। আমাদের দেশে যাহারা প্রকৃত শ্রোতা তাহারা গানটাকে শুনিলেই সস্তুষ্ট থাকে, যুরোপের শ্রোতারা গান-গাওয়াটাকে শোনে। সেদিন ব্রাইটনে তাই দেখিলাম—সেই গায়িকাটির গান গাওয়া অদ্ভুত আশ্চৰ্য্য। আমার মনে হইল যেন কণ্ঠস্বরে সার্কাসের ঘোড়া হাকাইতেছে। কণ্ঠনলীর মধ্যে সুরের লীলা কোথাও কিছুমাত্র বাধা পাইতেছে না। মনে যতই বিস্ময় অনুভব করি না কেন সেদিন গানটা আমার একেবারেই ভাল লাগিল না। বিশেষত তাহার মধ্যে স্থানে স্থানে পার্থীর ডাকের নকল ছিল, সে আমার কাছে অত্যন্ত হাস্যজনক মনে হইয়াছিল। মোটের উপর আমার কেবলি মনে হইতে লাগিল মনুষ্যকণ্ঠের প্রকৃতিকে যেন অতিক্রম করা হইতেছে । তাহার পরে পুরুষ গায়কদের গান শুনিয়া আমার আরাম বোধ হইতে লাগিল— বিশেষত “টেনর” গলা যাহাকে বলে—সেটা নিতান্ত একটা পথহারা ঝোড়ে।