পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বাল্মীকি-প্রতিভা | ১৩৯ সাজিয়াছিলাম এবং আমার ভ্রাতুপুত্র প্রতিভা সরস্বতী সাজিয়াছিল— বাল্মীকি-প্রতিভ নামের মধ্যে সেই ইতিহাসটুকু রহিয়া গিয়াছে। হর্বাটু স্পেন্সরের একটা লেখার মধ্যে পড়িয়াছিলাম যে, সচরাচর কথার মধ্যে যেখানে একটু হৃদয়াবেগের সঞ্চার হয় সেখানে আপনিই কিছু না কিছু স্থর লাগিয়া যায় । বস্তুত রাগ দুঃখ আনন্দ বিস্ময় আমরা কেবলমাত্র কথা দিয়া প্রকাশ করি না—কথার সঙ্গে সুর থাকে। এই কথাবার্তার আনুষঙ্গিক সুরটারই উৎকর্ষ সাধন করিয়া মানুষ সঙ্গীত পাইয়াছে। স্পেন্সরের এই কথাটা মনে লাগিয়াছিল । ভাপিয়ছিলাম এই মত গনুসারে আগাগোড়া স্থর করিয়া নানা ভাবকে গানের ভিতর দিয়া প্রকাশ করিয়া অভিনয় করিয়া গেলে চলিবে না কেন ? তামাদের দেশে কথকতায় কতকটা এই চেষ্টা আছে ; তাহাতে বাক্য মাঝে মাঝে স্তরকে আশ্রয় করে, অথচ তাহা তালমানসঙ্গত রীতিমত সঙ্গীত নহে । ছন্দ হিসাবে অমিত্রীক্ষর ছন্দ যেমন, গান হিসাবে এও সেইরূপ—ইহাতে তালের কড়াক্কড় বপিন নাই— একটা লয়ের মাত্রা আছে,—ইহার একমাত্র উদেশ্য কথার ভিতরকার ভাবাবেগকে পরিস্ফুট করিয়া তোলা—কোনো বিশেষ রাগিণী বা তালকে বিশুদ্ধ করিয়া প্রকাশ করা নহে। বাল্মীকি-প্রতিভায় গানের বাধন সম্পূর্ণ ছিন্ন করা হয় নাই, তবু ভাবের অমৃগমন করিতে গিয়া তালটাকে খাটাে করিতে হইয়াছে। অভিনয়টাই মুখ্য হওয়াতে এই তালের ব্যতিক্রম শ্রোতাদিগকে দুঃখ দেয় না। বাল্মীকি-প্রতিভার গানসম্বন্ধে এই নূতন পন্থায় উৎসাহ বোপ করিয়া এই শ্রেণীর আরো একটা গীতিনাট্য লিখিয়াছিলাম। তাহার নাম কালমৃগয়া। দশরথকর্তৃক অন্ধমুনির পুত্রবধ তাহার নাট্যবিষয় । তেতালার ছাদে ষ্টেজ খাটাইয়৷ ইহার অভিনয় হইয়াছিল—ইহার করুণরসে শ্রোতারা অত্যন্ত বিচলিত হইয়াছিলেন। পরে, এই গীতনাট্যের অনেকটা অংশ বাল্মীকি-প্রতিভার সঙ্গে মিশাইয়া দিয়াছিলাম বলিয়৷ ইহা গ্রন্থাবলীর মধ্যে প্রকাশিত হয় নাই ।