পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গঙ্গাতীর । Ꮌ ᏭᎼ অন্নপরিবেষণ হইয়া থাকে। আমার পক্ষে বাংলাদেশের এই আকাশভর আলো, এই দক্ষিণের বাতাস, এই গঙ্গার প্রবাহ, এই রাজকীয় আলস্য, এই আকাশের নীল ও পৃথিবীর সবুজের মাঝখানকার দিগন্তপ্রসারিত উদার অবকাশের মধ্যে সমস্ত শরীর মন ছাড়িয়া দিয়া আত্মসমপণ—তৃষ্ণার জল ও ক্ষুধার খাদ্যের মতই অত্যাবশ্বক ছিল। সে ত খুব বেশি দিনের কথা নহে—তবু ইতিমধ্যেই সময়ের অনেক পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। অামাদের তরুচ্ছায়াপ্রচ্ছন্ন গঙ্গাতটের নিভৃত নীড়গুলির মধ্যে কলকারখানা, উৰ্দ্ধফণা সাপের মত প্রবেশ করিয়া সে সে শব্দে কালো নিঃশ্বাস ফুসিতেছে। এখন খরমধ্যাহ্নে আমাদের মনের মধ্যেও বাংলাদেশের প্রশস্ত স্নিগ্ধছায় সঙ্কীর্ণতম হইয়া আসিয়াছে । এখন দেশের সর্বত্রই অনবসর আপনি সহস্ৰ বাহু প্রসারিত করিয়া ঢুকিয়া পড়িয়াছে। হয় ত সে ভালই—কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন ভালে৷ এমন কথাও জোর করিয়া বলিতে পারি না । আমার গঙ্গাতীরের সেই সুন্দর দিনগুলি গঙ্গার জলে উৎসর্গ করা পূর্ণবিকশিত পদ্মফুলের মত একটি একটি করিয়া ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কখনো বা ঘনঘোর বর্মার দিনে হাৰ্ম্মোনিয়ম যন্ত্রযোগে বিদ্যাপতির “ভরাবাদর মাহভাদর” পদটিতে মনের মত সুর বসাইয়া বৰ্মার রাগিণী গতিতে গাহিতে বৃষ্টিপাতমুখরিত জলধারাচ্ছন্ন মধ্যাঙ্গ ক্ষ্যাপার মত কাটাইয়া দিতাম ; কখনো বা সূৰ্য্যাস্তের সময় আমরা নৌকা লইয়া বাহির হইয়া পড়িতাম—জ্যোতিদাদা বেহালা বাজাইতেন আমি গান গাহিতাম : পূরবী রাগিণী হইতে আরম্ভ করিয়া যখন বেহাগে গিয়া পোছিতাম তখন পশ্চিমতটের আকাশে সোনার খেলনার কারখানা একেবারে নিঃশেষে দেউলে হইয়া গিয়া পূর্ববনান্ত হইতে চাদ উঠিয়া আসিত । আমরা যখন বাগানের ঘাটে ফিরিয়া আসিয়া নদীতীরের ছাদটার উপরে বিছানা করিয়া বসিতাম তখন জলে স্থলে শুভ্ৰ শান্তি, নদীতে নৌকা প্রায় নাই, তীরের বনরেখা অন্ধকারে নিবিড়, নদীর তরঙ্গহীন প্রবাহের উপর আলো ঝিকঝিক্ করিতেছে। আমরা যে বাগানে ছিলাম তাহা মোরান সাহেবের বাগান নামে খ্যাত