পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৩৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


>@义 জীবন-স্মৃতি । সঙ্গে তাহার অন্তরের স্বর যখন মেলে না—সামঞ্জস্য যখন স্বন্দর ও সম্পূর্ণ হইয় উঠে না তখন সেই অন্তরনিবাসীর পীড়ার বেদনায় মানসপ্রকৃতি ব্যথিত হইতে থাকে। এই বেদনাকে কোনো বিশেষ নাম দিতে পারি না—ইহার বর্ণনা নাই—এইজন্য ইহার যে রোদনের ভাষা তাহা স্পষ্ট ভাষা নহে— তাহার মধ্যে অর্থবদ্ধ কথার চেয়ে অর্থহীন সুরের অংশই বেশি। সন্ধ্যাসঙ্গীতে যে বিষাদ ও বেদন ব্যক্ত হইতে চাহিয়াছে তাহার মূল সত্যটি সেই অন্তরের রহস্যের মধ্যে । সমস্ত জীবনের একটি মিল যেখানে আছে সেখানে জীবন কোনো মতে পৌঁছিতে পারিতেছিল না। নিদ্রায় অভিভূত চৈতন্য যেমন দুঃস্বপ্নের সঙ্গে লড়াই করিয়া কোনো মতে জাগিয়া উঠিতে চায়—ভিতরের সন্তাটি তেমনি করিয়াই বহিরের সমস্ত জটিলতাকে কাটাইয়া নিজেকে উদ্ধার করিবার জন্য যুদ্ধ করিতে থাকে—অন্তরের গভীরতম অলক্ষ্য প্রদেশের সেই যুদ্ধের ইতিহাসই অস্পষ্ট ভাষায় সন্ধ্যাসঙ্গীতে প্রকাশিত হইয়াছে। সকল সৃষ্টিতেই যেমন দুই শক্তির লীলা, কাব্যস্থষ্টির মধ্যেও তেমনি । যেখানে অসামঞ্জস্য অতিরিক্ত অধিক, অথবা সামঞ্জস্য যেখানে সম্পূর্ণ, সেখানে কাব্যলেখ বোধ হয় চলে না । যেখানে অসামঞ্জস্যের বেদনাই প্রবল ভাবে সামঞ্জস্যকে পাইতে ও প্রকাশ করিতে চাহিতেছে সেইখানেই কবিতা বঁশির অবরোধের ভিতর হইতে নিঃশ্বাসের মত রাগিণীতে উচ্ছসিত হইয় উঠে । সন্ধাসঙ্গীতের জন্ম হইলে পর সূতিকাগৃহে উচ্চস্বরে শাখ বাজে নাই বটে কিন্তু তাই বলিয় কেহ যে তাহণকে আদর করিয়া লয় নাই তাহা নহে । আমার অন্য কোনো প্রবন্ধে আমি বলিয়াছি—রমেশদত্ত মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহ-সভার দ্বারের কাছে বঙ্কিম বাবু দাড়াইয়া ছিলেন ;—রমেশবাবু বঙ্কিম বাবুর গলায় মাল পরাইতে উদ্যত হইয়াছেন এমন সময়ে আমি সেখানে উপস্থিত হইলাম। বঙ্কিম বাবু তাড়াতাড়ি সে মালা তামার গলায় দিয়া বলিলেন, “এ মালা ইহারই প্রাপ্য—রমেশ তুমি সন্ধ্যাসঙ্গীত পড়িয়াছ ?” তিনি বলিলেন “না” । —তখন বঙ্কিম বাবু সন্ধ্যাসঙ্গীতের কোনো কবিতা সম্বন্ধে যে মত ব্যক্ত করিলেন তাহাতে আমি পুরস্কৃত হইয়াছিলাম ।