পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৭৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


>b"8 জীবন-স্মৃতি । ভাল করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মার মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না । বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ঙ্কর, সে দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না ; —সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে রূপ দেখিলাম তাহ সুখমৃপ্তির মতই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না । কেবল যখন র্তাহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনি শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক দম কায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকর্নার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না । বেলা হইল, শ্মশান হইতে ফিরিয়া আসিলাম ; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম—তিনি তখনো তাহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয় উপাসনায় বসিয়া আছেন । বাড়িতে যিনি কনিষ্ঠ বধু ছিলেন তিনিই মাতৃহীন বালকদের ভার লইলেন। তিনিই আমাদিগকে খাওয়াইয় পরাইয়। সর্বদ কাছে টানিয়া, আমাদের যে কোনো অভাব ঘটিয়াছে তাহা ভুলাইয়। রাখিবার জন্য দিনরাত্রি চেষ্টা করিলেন। যে ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণশক্তির একটা প্রধান অঙ্গ ;—শিশুকালে সেই প্রাণশক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীরভাবে গ্রহণ করে না, স্থায়ী রেখায় অ কিয় রাখে না । এই জন্য জীবনে প্রথম যে মৃত্যু কালো ছায় ফেলিয় প্রবেশ করিল, তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতই একদিন নিঃশব্দপদে চলিয়া গেল। ইহার পরে বড় হইলে যখন বসন্তপ্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাধিয়া ক্ষ্যাপার মত বেড়াইতাম—তখন সেই কোমল চিকণ কুড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয় প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত –