পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৪
জীবন-স্মৃতি।

খেলিবার জন্য যাইতাম বলিলে ঠিক বলা হয় না। খেলাটার চেয়ে এই জায়গাটারই প্রতি আমার টান বেশি ছিল। তাহার কারণ কি বলা শক্ত। বোধ হয় বাড়ির কোণের একটা নিভৃত পোড়ো জায়গা বলিয়াই আমার কাছে তাহার কি একটা রহস্য ছিল। সে আমাদের বাসের স্থান নহে, ব্যবহারের ঘর নহে; সেটা কাজের জন্যও নহে; সেটা বাড়িঘরের বাহির, তাহাতে নিত্য প্রয়োজনের কোনো ছাপ নাই; তাহা শোভাহীন অনাবশ্যক পতিত জমি, কেহ সেখানে ফুলের গাছও বসায় নাই; এই জন্য সেই উজাড় জায়গাটায় বালকের মন আপন ইচ্ছামত কল্পনায় কোনো বাধা পাইত না। রক্ষকদের শাসনের একটু মাত্র রন্ধ্র দিয়া যে দিন কোনো মতে এইখানে অসিতে পরিতাম সে দিন ছুটির দিন বলিয়াই বোধ হইত।

 বাড়িতে আরো একটা জায়গা ছিল সেটা যে কোথায় তাহা আজ পৰ্য্যন্ত বাহির করিতে পারি নাই। আমার সমবয়স্ক খেলার সঙ্গিনী একটি বালিকা সেটাকে রাজার বাড়ি বলিত। কখনো কখনো তাহার কাছে শুনিতাম “আজ সেখানে গিয়াছিলাম।” কিন্তু এক দিনও এমন শুভযোগ হয় নাই যখন আমিও তাহার সঙ্গ ধরিতে পারি। সে একটা আশ্চৰ্য্য জায়গা, সেখানে খেলাও যেমন আশ্চৰ্য্য খেলার সামগ্ৰীও তেমনি অপরূপ। মনে হইত সেটা অত্যন্ত কাছে; এক তলায় বা দোতলায় কোনো একটা জায়গায়; কিন্তু কোনোমতেই সেখানে যাওয়া ঘটিয়া উঠেনা। কতবার বালিকাকে জিজ্ঞাস করিয়াছি, রাজার বাড়ি কি আমাদের বাড়ির বাহিরে? সে বলিয়াছে, না, এই বাড়ির মধ্যেই। আমি বিস্মিত হইয়া বসিয়া ভাবিতাম, বাড়ির সকল ঘরই ত তামি দেখিয়াছি কিন্তু সে ঘর তবে কোথায়? রাজা যে কে সে কথা কোন দিন জিজ্ঞাসাও করি নাই, রাজত্ব যে কোথায় তাহা আজ পর্য্যন্ত অনাবিষ্কৃত রহিয়া গিয়াছে, কেবল এইটুকু মাত্র পাওয়া গিয়াছে যে, আমাদের বাড়িতেই সেই রাজার বাড়ি।

 ছেলেবেলার দিকে যখন তাকানো যায় তখন সবচেয়ে এই কথাটা মনে পড়ে যে, তখন জগৎটা এবং জীবনটা রহস্যে পরিপূর্ণ। সর্ব্বত্রই যে