পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৬
জীবন-স্মৃতি।

ইহাতে কতদিন যে মনকে ধাক্কা দিয়াছে তাহা বলিতে পারি না। কি করিলে পৃথিবীর উপরকার এই মেটে রঙের মলাটটাকে খুলিয়া ফেলা যাইতে পারে তাহার কতই প্ল্যান্‌ ঠাওরাইয়াছি। মনে ভাবিতাম, একটার পর আর একটা বাঁশ যদি ঠুকিয়া ঠুকিয়া পোঁতা যায়; এমনি করিয়া অনেক বাঁশ পোঁতা হইয় গেলে পৃথিবীর খুব গভীরতম তলটাকে হয় ত একরকম করিয়া নাগাল পাওয়া যাইতে পারে। মাঘোৎসব উপলক্ষ্যে আমাদের উঠানের চারিধারে সারি সারি করিয়া কাঠের থাম পুঁতিয়া তাহাতে ঝাড় টাঙানো হইত। পয়লা মাঘ হইতেই এজন্য উঠানে মাটিকাটা আরম্ভ হইত। সর্ব্বত্রই উৎসবের উদ্যোগের আরম্ভটা ছেলেদের কাছে অত্যন্ত ঔৎসুক্যজনক। কিন্তু আমার কাছে বিশেষভাবে এই মাটিকাটা ব্যাপারের একটা টান ছিল। যদিচ প্রত্যেক বৎসরই মাটি কাটিতে দেখিয়াছি—দেখিয়াছি গৰ্ত্ত বড় হইতে হইতে একটু একটু করিয়া সমস্ত মানুষটাই গহ্বরের নীচে তলাইয়া গিয়াছে অথচ তাহার মধ্যে কোনোবারই এমন কিছু দেখা দেয় নাই যাহা কোনো রাজপুত্র বা পাত্রের পুত্রের পাতালপুরযাত্রা সফল করিতে পারে তবুও প্রত্যেক বারেই আমার মনে হইত একটা রহস্যসিন্ধুকের ডাল খোলা হইতেছে। মনে হইত যেন আর একটু খুঁড়িলেই হয়—কিন্তু বৎসরের পর বৎসর গেল সেই আরেকটুকু কোনোবারেই খোঁড়া হইল না। পর্দায় একটুখানি টান দেওয়াই হইল কিন্তু তোলা হইল না। মনে হইত বড়রা ত ইচ্ছা করিলেই সব করাইতে পারেন তবে তাঁহারা কেন এমন অগভীরের মধ্যে থামিয়া বসিয়া আছেন—আমাদের মত শিশুর আজ্ঞা যদি খাটিত তাহ হইলে পৃথিবীর গুঢ়তম সংবাদটি এমন উদাসীনভাবে মাটিচাপা পড়িয়া থাকিত না। আর যেখানে আকাশের নীলিমা তাহারই পশ্চাতে আকাশের সমস্ত রহস্য, সে চিন্তাও মনকে ঠেলা দিত। যেদিন বোধোদয় পড়াইবার উপলক্ষ্যে পণ্ডিতমহাশয় বলিলেন, আকাশের ঐ নীল গোলকটি কোনো একটা বাধামাত্রই নহে তখন সেটা কি অসম্ভব আশ্চর্য্যই মনে হইয়াছিল! তিনি বলিলেন, সিঁড়ির উপর সিঁড়ি লাগাইয়া উপরে উঠিয়া যাও না, কোথাও মাথা ঠেকিবে না।