পাতা:জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৯
ভৃত্যরাজক তন্ত্র।

বিশ্বাস করিতেছে না। জলে স্থলে আকাশে এবং লোকব্যবহারের রন্ধ্রে, রন্ধ্রে, অসংখ্য দোষ প্রবেশ করিয়া আছে, অহোরাত্র সেই গুলাকে কাটাইয়া চলা তাহার এক বিষম সাধন ছিল। বিশ্ব-জগৎটা কোনো দিক্‌ দিয়া তাহার গায়ের কাছে আসিয়া পড়ে ইহা তাহার পক্ষে অসহ্য। অতলস্পর্শ তাহার গাম্ভীৰ্য্য ছিল। ঘাড় ঈষৎ বাঁকাইয়া মন্দ্র স্বরে চিবাইয়া চিবাইয়া সে কথা কহিত। তাহার সাধুভাষার প্রতি লক্ষ্য করিয়া গুরুজনেরা আড়ালে প্রায়ই হাসিতেন। তাহার সম্বন্ধে আমাদের বাড়িতে একটা প্রবাদ রটিয়া গিয়াছিল যে সে “বরানগর”কে “বরাহনগর” বলে। এটা জনশ্রুতি হইতে পারে কিন্তু আমি জানি, “অমুক লোক বসে আছেন”—না বলিয়া সে বলিয়াছিল “অপেক্ষা করচেন।” তাহার মুখের এই সাধুপ্রয়োগ আমাদের পারিবারিক কৌতুকালাপের ভাণ্ডারে অনেকদিন পর্য্যন্ত সঞ্চিত ছিল। নিশ্চয়ই এখনকার দিনে ভদ্রঘরের কোনো ভৃত্যের মুখে “অপেক্ষা করচেন” কথাটা হাস্যকর নহে। ইহা হইতে দেখা যায় বাংলায় গ্রন্থের ভাষা ক্রমে চলিতভাষার দিকে নামিতেছে এবং চলিতভাষা গ্রন্থের ভাষার দিকে উঠিতেছে;—একদিন উভয়ের মধ্যে যে আকাশ পাতাল ভেদ ছিল এখন তাহা প্রতিদিন ঘুচিয়া আসিতেছে।

 এই ভূতপূর্ব্ব গুরুমহাশয় সন্ধ্যাবেলায় আমাদিগকে সংযত রাখিবার জন্য একটি উপায় বাহির করিয়াছিল। সন্ধ্যাবেলায় রেড়ির তেলের ভাঙা সেজের চারদিকে আমাদের বসাইয়া সে রামায়ণ মহাভারত শোনাইত। চাকরদের মধ্যে আরও দুই চারিটি শ্রোতা আসিয়া জুটিত। ক্ষীণ আলোক ঘরের কড়িকাঠ পর্য্যন্ত মস্ত মস্ত ছায়া পড়িত, টিক্‌টিকি দেয়ালে পোকা ধরিয়া খাইত, চাম্‌চিকে বাহিরের বারান্দায় উন্মত্ত দরবেশের মত ক্রমাগত চক্রাকারে ঘুরিত, আমরা স্থির হইয়া বসিয়া হাঁ করিয়া শুনিতাম। যেদিন কুশলবের কথা আসিল, বীরবালকের তাহাদের বাপখুড়াকে একেবারে মাটি করিয়া দিতে প্রবৃত্ত হইল, সেদিনকার সন্ধ্যাবেলার সেই অস্পষ্ট আলোকের সভা নিস্তব্ধ ঔৎসুক্যের নিবিড়তায় যে কিরূপ পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল তাহা এখনো মনে পড়ে। এদিকে রাত হইতেছে, আমাদের জাগরণকালের মেয়াদ ফুরাইয়া আসিতেছে, কিন্তু